ষাট বছর বয়সে পা রেখেই জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করলেন তিনি—বিয়ের মাধ্যমে।
গত ২৪ জুলাই চট্টগ্রামের হাটহাজারীর ছিপাতলী গ্রামের কুলসুমা বেগমকে বিয়ে করেন নাছির। কনের বাড়ি একই উপজেলার মন্দাকিনী এলাকায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ বিয়ের খবরে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। কেউ বলছেন—“জীবনের জয়গান”, কেউ বা বলছেন—“বিচারের দীর্ঘ পথে হার না মানা মানুষের গল্প”।
দীর্ঘ বন্দিজীবন, বিচার এবং মুক্তি- ১৯৯৮ সালের ৯ এপ্রিল শুরু হয়েছিল তার কারাজীবন। একের পর এক মামলা, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা আর বারবার জামিন প্রত্যাখ্যানের ভেতর দিয়ে কেটেছে ২৬টি বছর।
নাছিরের বিরুদ্ধে ছিল মোট ৩৬টি মামলা—যার মধ্যে ছিল হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও অপহরণের অভিযোগ। ৩১টি মামলায় খালাস পেয়েছেন তিনি। দুটিতে দণ্ড হলেও তা ইতোমধ্যে কারাভোগে শেষ হয়ে গেছে বলে গণ্য করা হয়। বাকি তিনটির মধ্যে দুই মামলায় আগে থেকেই জামিনে ছিলেন, আর শেষ মামলায় জামিন মেলে ২০২৩ সালের ১১ আগস্ট। সেই দিনই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি।
মামলা-ইতিহাস: অপরাধ না রাজনীতি? নাছির উদ্দিনের নাম এক সময় রাজনীতির ঘূর্ণিতে উঠে এসেছিল। অভিযোগ ছিল ইসলামী ছাত্রশিবিরের কট্টর নেতাদের একজন হিসেবে তিনি রাজনৈতিক সহিংসতায় জড়িত ছিলেন।
তবে তার আইনজীবী মনজুর আহমেদ আনসারীর দাবি, ‘নাছির রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। একের পর এক মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল তাকে।’
এমনকি চট্টগ্রাম শিবিরের বর্তমান মহানগর (উত্তর) সভাপতি তানজীর হোসেনও জানান, “নাছির সংগঠনের কোনো দায়িত্বে ছিলেন না। হয়তো মতাদর্শের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, সেজন্য এই নামকরণ।”
তবে তার বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে পুলিশের ওপর হামলা মামলায় ৫ বছর এবং ২০০৮ সালের একটি অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের দণ্ড ছিল। এর বাইরে চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ছাত্রনেতা জমির উদ্দিন হত্যা এবং অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরি হত্যা মামলার মতো আলোচিত ঘটনাতেও তাকে আসামি করা হয়েছিল—যেগুলো থেকে তিনি খালাস পান।
বিয়ের খুঁটিনাটি ও পারিবারিক প্রত্যাশা- নাছিরের বড় বোন লিলি আক্তার জানান, বিয়েতে দেনমোহর ধার্য করা হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। কনেপক্ষ থেকে কোনো যৌতুক নেওয়া হয়নি। পরিবার চাইছে—অতীত পেছনে ফেলে যেন তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারেন।
নাছির নিজেও সে আশায় বুক বাঁধছেন। বলেন, “সুন্দরভাবে সংসার করতে চাই। এখন আর কিছুই চাই না—শুধু শান্তি। ব্যবসা করব, ঘর সামলাবো, দাম্পত্য জীবনের সুখ চাই। সবার দোয়া চাই।”
এক যাত্রার শেষে আরেক শুরু নাছির উদ্দিন চৌধুরীর গল্পটা শুধুই একজন আসামির মুক্তি নয়, এটা একজন মানুষের জীবনে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়ার গল্প। যেখানে ষাটে পা দিয়েও জীবনের ইচ্ছেটা থেমে যায়নি।
অনেকে হয়তো তাকে অপরাধের সাথে যুক্ত করে মনে রাখবে। কিন্তু সমাজ, পরিবার, এমনকি বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে যদি কেউ ফেরার সুযোগ পায়—তাকে কি শুধুই ‘অভিযুক্ত’ বলা যায়?
শেষ পর্যন্ত জীবনই হয়তো তার সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য। আর সেই জীবন আজ বলছে—‘শিবির নাছির’ এখন একজন স্বামী, একজন স্বপ্ন দেখতে চাওয়া মানুষ।
