মূল সংবাদে যান
অপরাধ

জাতিসংঘ পার্ক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে নিম্নমান সামগ্রী !

সুপ্রভ নিলয়, চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম অন্যতম বিনোদনকেন্দ্র জুলাই স্মৃতি উদ্যান সাবেক জাতিসংঘ পার্ক উন্নয়নকাজে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
জাতিসংঘ পার্ক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে নিম্নমান সামগ্রী !

পার্কটিকে আধুনিকায়নের লক্ষ্য সংস্কার প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও ইতোমধ্যে অনেক জায়গায় ফাটল, খসখসে পৃষ্ঠ এবং ওয়ালে ফাটলের চিত্র চোখে পড়ছে। এতে কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাহাবুব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, “এখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ হাঁটতে আসে। কিন্তু এখনই যদি কাঠামো এ অবস্থা, কয়েক বছর পরে অবস্থা আরও খারাপ হবে। চোখে পড়ার মতো নিম্নমানের কাজ হয়েছে।নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করছেন, এ ধরনের কাজে গুণগত মান বজায় না রাখায় সরকারি অর্থ অপচয় হয় এবং জনগণের ভোগান্তিও বাড়ে।

সৌন্দর্যবর্ধন কাজে ব্যয় করা হয়েছে মাত্রাতিরিক্ত অর্থ। ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে করা এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের সামগ্রী। উদ্বোধনের একবছরের মাথায় ফেটে গেছে বাউন্ডরী দেয়াল। নষ্ট হয়ে গেছে দামি টাইলসের রং, সামান্য বৃষ্টিতে ওয়াকওয়েতে জমে থাকে পানি। সিমেন্টের মিশ্রণে নিম্নমানের বালির ব্যবহারের ফলে দেখা দিয়েছে ফুসকুরি। প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে লাগানো গাছের চারা সংখ্যায় খুব কম বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তৎকালীন জাতিসংঘ পার্কের সৌন্দর্যবর্ধন কাজের জন্য বিগত ২০২২ সালে ১১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় মন্ত্রণালয়। যেখানে ৩৫৩.৫৫ মিটার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অর্থাৎ প্রতি মিটারে খরচ হয়েছে ৬৯ হাজার ১৪২ টাকা।

সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞদের মতে এধরণের বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে মিটারপ্রতি সর্বোচ্চ ব্যয় (ঠিকাদারের লাভ ও ভ্যাট,ট্যাক্সসহ) হতে পারে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। ৪৪ টি আরসিসি বসার টুল বানানো হয়েছে ৩৫ লাখ ৯২ হাজার টাকায় প্রতিটির খরচ ৮১ হাজার ৬০০ টাকা, এ ধরণের একটি টুলের সর্বোচ্চ খরচ হতে পারে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

১ টি ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে ১৬ লাখ ৮৭ হাজার টাকায়, যার সর্বোচ্চ ব্যয় হতে পারে ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা। যেখানে মাটি পরীক্ষা করার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার টাকা, আবার মাণ নিয়ন্ত্রণ ,উপাদান নমুনা সংমগ্রি ও পরীক্ষাকরণ বাবদ ৩ লাখ টাকা। ১ টি ফাউন্টেন লাইটের দাম ধরা হয়েছে ২ লাখ টাকা, যেখানে ৪০/৫০ হাজার টাকায় ভালো মানের ফাউন্টেন লাইট পাওয়া যায়।

৭০ হাজার গ্যালনের একটি জলাধার ও ঝর্ণা নির্মাণের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা, আবার ২ টি মেটাল পারগোলার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৫ লাখ ৪৮ হাজার টাকা। শিশুদের খেলাধুলার জন্য ৫ টি সরঞ্জাম কেনা হয়েছে ১৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা, শরীর চর্চার জন্য ২টি হরিজন্টাল বার কেনা হয়েছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। পার্কের ভেতরে ছোট ছোট গাছের চারা লাগানো বাবদ ব্যয় করেছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। একটা স্ট্রীট লাইট খাম্বার ওপর লাগানো বজ্র নিরোধক ব্যবস্থার জন্য ব্যয় করেছে ১৭ লাখ ৬৯ হাজার টাকা, একটি ৩০ কেভিএ ডিজেল জেনারেটরের জন্য ব্যয় করেছে ২০ লাখ টাকা।

২০২৪ সালে কাজ শেষ হওয়া পার্কটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রতি মিটার ৬৯ হাজার ১৪২ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাউন্ডরী ওয়ালে ফাটল দেখা গেছে। পার্কের চারদিকেই এমন ফাটল চোখে পড়েছে। ভেতরে লাগানো অধিক দামের টাইলস এর রং নষ্ট হয়ে গেছে, টাইলসের মাঝখানে থাকা সিমেন্ট খুলে গ্যাপ সৃষ্টি হয়েছে। ওয়াকওয়েসহ বসার জায়গায় টুলের নিচে পানি জমে আছে। অথচ পানি নিস্কাশনের জন্য মোটর ব্যবহার করা হলেও তা অকার্যকর। ৪৪ টি আরসিসি টুল বানানোর কথা থাকলেও আছে অনেক কম। ঝর্ণায় লাগানো টাইলস অনেক স্থানে সাদা হয়ে গেছে।

অভিজ্ঞ প্রকৌশলীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই পার্কের সৌন্দর্যবর্ধন কাজে যে ব্যয় দেখানো হয়েছে তা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের। ময়লা ও লবানাক্ত বালি ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে ফুসকুরি দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় সিমেন্ট দেয়া হয়ে কম। ফলে সিমেন্ট ছুটে যাচ্ছে। নিম্নমানের সামগ্রীর ফলে দেয়াল ফেটে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সিন্ডিকেট মিলে সরকারের বড় অংকের টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের গণপূর্ত সার্কেল ১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম বলেন, বাউন্ডারী ওয়ালের ফাটলগুলো আমি দেখেছি, কিছু রড বাকা হয়ে গেছে, ফলে এমন ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০১২ সালে জাতিসংঘ পার্কের একাংশে এক একর জায়গার ওপর সুইমিংপুল ও জিমনেশিয়াম নির্মাণ করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ২০১৫ সালের ২৬ জুলাই সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন আ জ ম নাছির উদ্দীন।

অপরিকল্পিতভাবে সুইমিংপুল নির্মাণ করা হয়েছে অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালে পার্ককে এলিট পার্ক লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২৫ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেন তিনি। প্রতিষ্ঠানটি সেখানে কমিউনিটি সেন্টার, অতিথি হাউসসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করে। আ জ ম নাছিরের এই বাণিজ্যিক উদ্যোগ তৎকালীন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এবং পাঁচলাইশ আবাসিক সমিতির বাধার মুখে পড়ে আর বাস্তবায়ন হয়নি।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গণপূর্ত অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত “চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন জাতিসংঘ সবুজ উদ্যান (বর্তমানে জুলাই স্মৃতি উদ্যান) উন্নয়ন”-শীর্ষক বিনিয়োগ প্রকল্পটি বিগত ২০২২ সালের ৪ জুলাই পরিকল্পনা মন্ত্রী অনুমোদন দিয়েছে। মোট ব্যয় ১১ কোটি ৭০ লাখ ১২ হাজার টাকা। বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২২ হতে জুন ২০২৪ পর্যন্ত।

সম্পর্কিত বিষয়

  • জাতিসংঘ পার্ক
  • সৌন্দর্যবর্ধন
  • নির্মাণসামগ্রী

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন