মূল সংবাদে যান
অপরাধ

ভেজাল ওষুধে সয়লাব চট্টগ্রাম!

ভেজাল ওষুধে সয়লাব চট্টগ্রাম! এমনকি জীবন রক্ষাকারী ওষুধও নকল। চট্টগ্রাম শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রায় ৪০ শতাংশ ওষুধ নকল বা ভেজাল—এমন আশঙ্কা করছেন স্থানীয় ফার্মেসি মালিকরা।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
ভেজাল ওষুধে সয়লাব চট্টগ্রাম!

সবচেয়ে উদ্বেগজনক, ইনস্যুলিন ও ইনজেকশনের মতো সংবেদনশীল ওষুধও এই জালের বাইরে নয়, যা জনস্বাস্থ্যকে ঠেলে দিচ্ছে এক ভয়াবহ সংকটে। জনস্বাস্থ্যকে রক্ষা করতে হলে চট্টগ্রামে ওষুধ বাজারের এই সঙ্গবদ্ধ জাল এখনই ছিন্ন করা জরুরি। ভেজাল ওষুধ উৎপাদক, বিক্রেতা ও পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রামের বাজারে নকল ওষুধের বিস্তার নগরীর পাইকারি ওষুধ বিক্রেতাদের মার্কেট হাজারী লেন ছাড়াও নামকরা ফার্মেসি থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত এলাকার দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে নকল ওষুধ। বিক্রেতারা বলছেন, ইনজেকশন ও ইনস্যুলিন জাতীয় ওষুধে নকলের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। অবৈধ মুনাফার লোভে অনৈতিক বাণিজ্য চালিয়ে নিতে অনেকেই বুঝে না বুঝে এই ওষুধ বিক্রি করছেন। কেউ আবার বেশি লাভের আশায় সচেতনভাবেই ভেজাল পণ্য তুলে দিচ্ছেন রোগীর হাতে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এটিকে একটি চরম অন্যায় জানিয়ে বলেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে এটি এক ‘নীরব গণহত্যা’য় পরিণত হবে। নিয়মিত অভিযান আর কঠোর শাস্তিই হতে পারে এর প্রতিকার। একইসঙ্গে দরকার ওষুধ শিল্পে নীতিগত সংস্কার। দেশব্যাপী জীবন রক্ষাকারী নকল ও ভেজাল ওষুধের যে ‘নীরব মহামারি’ ছড়িয়ে পড়েছে, তার ভয়াল থাবা পড়েছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামেও। চট্টগ্রামের ওষুধের বাজারে যদি প্রায় ৪০ শতাংশ ওষুধই নকল হয়, তাহলে রোগীরা বাঁচবে কিভাবে?

প্রশাসনের নীরবতা ও দুর্বল তদারকির বিষয়ে বিক্রেতারা অভিযোগ করে বলেছেন, তদারককারী সংস্থার অনেকেই অসাধু চক্রের কাছ থেকে মাসোয়ারা পান। ফলে ভেজাল ওষুধের বাজার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। খেসারত দিতে হচ্ছে নীরিহ রোগীদের। বিদেশি আমদানিকৃত ইনজেকশন ও দামী ওষুধের নকলই বেশি পাওয়া যায়। অসাধু চক্র একই রকম মোড়ক ও রং ব্যবহার করে এসব নকল ওষুধ বাজারে ছাড়ছে। এই চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, অনেক বিক্রেতা না বুঝেই এসব ওষুধ বিক্রি করছেন।

আমাদের অনেকেই আবার কম দামে কিনে বেশি লাভে বিক্রির লোভে এই অনৈতিক বাণিজ্যে জড়াচ্ছেন। বিশেষ করে চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত উপজেলায় এসব ভেজাল ওষুধের ব্যবসা চলে সবচেয়ে বেশী। বিশেস করে বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড ও ফটিকছড়ির গ্রামগুলোতে ভেজাল ওষুধের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি। সেখানে তদারকি কম থাকায় নিম্নমানের ওষুধ কোম্পানিগুলোর নকল ও ভেজাল ওষুধ কম দামে সহজেই বিক্রি হচ্ছে।

ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক আশরাফ হোসেন জানান, ভেজাল ওষুধের বিষয়ে দেশব্যাপী আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। কিন্তু আমাদের জনবলের ঘাটতির কারণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না বলে স্বীকার করেছে। সীমিত জনবল দিয়ে ওষুধের বিশাল বাজার তদারকি করা এবং নকল-ভেজাল রোধ করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানান তিনি।

নকল ও ভেজাল ওষুধের ভয়াবহতা নিয়ে চট্টগ্রামের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বেশির ভাগ কোম্পানির ওষুধ তৈরির কাঁচামালই নিম্নমানের। তার ওপর আবার নকল করা হলে তা বিষে পরিণত হতে বাধ্য। শিশুদের ক্ষেত্রে নকল ওষুধ জীবন রক্ষার বদলে জীবন কেড়ে নিতে পারে। এই নকল ওষুধের উৎপাদক বা আমদানিকারকদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। গর্ভবতী মায়েদের জন্য নকল ওষুধ মা ও শিশু উভয়ের জন্যই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।”

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এমিরেটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, “নকল ও ভেজাল ওষুধ সেবনে রোগীর দেহে মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, এমনকি অঙ্গহানিরও সম্ভাবনা রয়েছে। যে রোগের জন্য ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, নকল ওষুধের কারণে সেই রোগ তো সারবেই না, উল্টো কিডনি বা লিভার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।”

ঔষধ শিল্প সমিতি বলছে, দেশের ২২৯টি কোম্পানি মানসম্মত ওষুধ উৎপাদন করছে এবং অর্ধশতাধিক কোম্পানি বিদেশে রপ্তানি করে সুনাম অর্জন করছে। কিন্তু কিছু অসাধু চক্রের কারণে পুরো ওষুধ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতকে এক নীরব মহাদুর্যোগ থেকে বাঁচাতে হলে এখনই চট্টগ্রামসহ দেশজুড়ে একযোগে সমন্বিত অভিযান পরিচালনা এবং নকল ওষুধের উৎপাদক, বিক্রেতা ও তাদের মদদদাতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত বিষয়

  • ভেজাল ওষুধ
  • চট্টগ্রাম
  • জীবন রক্ষাকারী
  • জিরো টলারেন্স
  • হাজারী লেন
  • অনৈতিক

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন