এতে সোয়া দুই মাস অতিক্রম হলেও এই তদন্ত আলোর মুখ দেখেনি। চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য গৃহিত প্রকল্প বাস্তবায়নে পদে পদে গুরুতর অনিয়ম করা হয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়মের পাহাড় সমান অভিযোগ থাকলেও কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছেনা।
সেসব দুর্নীতির তদন্ত করতে মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি গঠন করা হলেও সিদ্ধান্তহীন পড়ে আছে সেই তদন্ত। কমিটি গঠনের ৭ মাস অতিক্রম করলেও এখনো কোন মিটিং করতে পারেনি তদন্ত কমিটি। কমিটির অবহেলায় কার্যক্রম সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ২৩ এপ্রিল সেই কমিটি পূণর্গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে আহবায়ক করা হয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুবিভাগ-১ এর অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনকে আর সদস্যসচিব করা হয়েছে চট্টগ্রাম উন্ননয় কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে।
কিন্তু সোয়া দুই মাসেও তদন্তের আলোর মুখ দেখেনি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে চলছে নানা সমালোচনা। নিছক ব্যস্ততা নাকি দুর্নীতিবাজদের বাঁচাতে কেউ কলকাঠি নাড়ছেন তা নিয়ে রয়েছে সংশয়। দুর্নীতির সাথে জড়িতরা নানাভাবে তদবীর করছে বলেও বিশ্বস্ত সুত্রে জানা গেছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখা-২ এর উপসচিব এবং তদন্ত কমিটির সদস্য মো. নাজমুল আলম কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
কমিটির সদস্য এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখা-২ এর উপসচিব মো. নাজমুল আলম বলেন, পূর্বের কমিটি বাদ দিয়ে নতুনভাবে কমিটি পূণর্গঠন করা হয়েছে। কমিটির আহবায়ক অসুস্থ থাকায় আমরা এখনো কাজ শুরু করতে পারিনি, মিটিং করতে পারিনি। ২ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে, কিন্তু ২ মাসতো চলে গেল, কবে নাগাদ প্রতিবেদন দিতে পারবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ”কাজটি ছোট নয়, এর পরিধি অনেক বড়, একটু সময়তো লাগবে। আশা করছি আহবায়ক মহোদয় সুস্থ হলে কাজ শুরু হবে। তবে আমরা কোন অনিয়মকে প্রশ্রয় দিব না, যা সত্য তাই প্রতিবেদন দেয়া হবে।
অভিযোগ ওঠেছে, টানা ১৬ বছর সরকার পরিচালনা করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, সেসময়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ হতে যে যেভাবে পারছে সেভাবেই তদবীর করছে। সেই তদবীর করতে গিয়ে অনৈতিকভাবে আয় করেছে বিপুল অর্থ, আর সেই অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছে পদ-পদবী। সিডিএ’র ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে পছন্দের লোকদেরকে দেয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সহকারী প্রকৌশলীদের করা হয়েছে বড় বড় প্রকল্পের পরিচালক (পিডি)। আর তারা দায়িত্ব নিয়েই শুরু করেছেন অনিয়ম।
বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এসব বিষয় নিয়ে সিডিএ এর প্রধান প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন প্রকল্পের পিডি, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ১৫ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কশিনে (দুদক) মামলা চলমান আছে। মামলা থাকার কারনে তাদের প্রমোশন বন্ধ রয়েছে দীর্ঘদিন। ফলে তারা অবসরে যাওয়ার সময় কোন আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। অনেকেই সেই অর্থ পাবেনা জেনে অনিয়মের মাধ্যমে দুই হাতে টাকা কামাচ্ছেন। এতে মামলা জটিলতায় পড়েছেন সৎ অফিসারও।
এসব জটিলতা কাটাতে ও দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করতে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। কমিটির কার্যক্রম সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ২৩ এপ্রিল সেই কমিটি পূণর্গঠন করা হয়েছে। এই কমিটিতে আহবায়ক করা হয়েছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন অনুবিভাগ-১ এর অতিরিক্ত সচিব মো. আব্দুল মতিনকে আর সদস্যসচিব করা হয়েছে চট্টগ্রাম উন্ননয় কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সচিব রবীন্দ্র চাকমাকে।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের মনিটরিং এন্ড অডিট সার্কেল ঢাকার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সাইদ মাহবুব মোরশেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অধিশাখা-২ এর উপসচিব মো. নাজমুল আলম, সিডিএর বোর্ড সদস্য স্থপতি সৈয়দা জারিনা হোসাইন ও সৈয়দ কুদরত আলী। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ড. মো. নুরুল আমিন এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
কমিটির কার্য পরিধি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ”কমিটি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিগত সরকারের আমলে উন্নয়ন প্রকল্প সমূহের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রাপ্ত অভিযোগ সমূহ ও প্রকল্প বাস্তবায়নকালে অনিয়মসমূহ যাচাইপূর্বক সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিল করবেন, কমিটি প্রয়োজনে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যাক্তি/প্রতিষ্ঠানের মতামত গ্রহণ করতে পারবেন, কমিটি আগামী দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর দাখিল করবেন।”
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিডিএ’র একাধিক কর্মকর্তা জানান, যেসব অফিসার বিগত সরকারের আমলে নানা অনিয়মে জড়িত তারা অনৈতিকভাবে বিপুল পরিমান অর্থ আয় করেছেন, অনেকের সন্তানরা আমেরিকাতে লেখাপড়া করছে, অনেকে একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন আবার অনেকে বিদেশে পাচার করেছেন টাকা। তারা আবার এখনো বহাল তবিয়তে আছে, তাদের অনৈতিক টাকার মেশিন এই পদ ধরে রাখতে নানাভাবে তদবীর চালাচ্ছেন। কমিটিকে ম্যানেজ করার চেষ্টাও করছেন কেউ কেউ।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম উন্ননয় কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) সচিব ও তদন্ত কমিটির সদস্যসচিব রবীন্দ্র চাকমার সাথে দেখা করতে চাইলে ব্যস্ততার অযুহাতে তিনি দেখা করেননি।
