মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

বেইজিং থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব

বেইজিং থেকে বাংলাদেশের জন্য নতুন এক ভূ-অর্থনৈতিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত এসেছে। আঞ্চলিক সংযোগে নতুন অধ্যায় হলেও সামনে রয়েছে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চ্যালেঞ্জ।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
বেইজিং থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব

বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের সঙ্গে একটি অর্থনৈতিক করিডোর (ইকোনমিক করিডোর) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে শুক্রবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এই প্রস্তাব উঠে আসে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, কানেক্টিভিটি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রতিরক্ষা, রোহিঙ্গা সংকট এবং ব্রিকসে বাংলাদেশের সম্ভাব্য সদস্যপদসহ বিভিন্ন কৌশলগত বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের লক্ষ্য হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিধি বৃদ্ধি, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

অর্থনৈতিক করিডোর: বাংলাদেশের জন্য কী অর্থ বহন করে?

বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল পর্যন্ত করিডোর প্রতিষ্ঠিত হলে এটি শুধু একটি সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প হবে না; বরং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে নতুন বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই করিডোর বাস্তবায়িত হলে—

চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর আঞ্চলিক ট্রানজিট হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য চীনের ইউনান প্রদেশসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে তুলনামূলক কম সময় ও কম ব্যয়ে পৌঁছাতে পারবে। লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ, পরিবহন এবং সীমান্ত বাণিজ্য খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। শিল্পাঞ্চল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। চট্টগ্রাম বন্দরকে আঞ্চলিক হাবে গড়ার আগ্রহ

বৈঠকে চীন চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আলোচনায় উঠে এসেছে, কীভাবে এই বন্দরকে শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট ও লজিস্টিকস হাব হিসেবে গড়ে তোলা যায়।

একই সঙ্গে মোংলা বন্দরকে আরও আধুনিক, সেবামুখী ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের উপযোগী করার বিষয়েও চীন সহযোগিতার আগ্রহ দেখিয়েছে।

যদি এই বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হয়, তবে বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সক্ষমতায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

কানেক্টিভিটির সঙ্গে জড়িত ভূরাজনীতি

বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার করিডোরের প্রস্তাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক মাত্রাও রয়েছে।

চীন দীর্ঘদিন ধরে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে সংযুক্ত করতে বৃহৎ অবকাঠামো ও বাণিজ্য নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। ফলে এমন করিডোর বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হতে পারে।

তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে—

মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত; রাখাইন অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি; সীমান্ত অবকাঠামোর ঘাটতি; আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা; প্রকল্পের অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা। শিক্ষা, প্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা

দুই দেশের আলোচনায় অর্থনীতির পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নও গুরুত্ব পেয়েছে।

চীন জানিয়েছে—

ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষায় শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সহায়তা দেবে; কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষায় সহযোগিতা করবে; প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তরে কাজ করবে; কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে যৌথ উদ্যোগ নেবে।

স্বাস্থ্য খাতে রোবোটিক সার্জারি, আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ এবং বাংলাদেশিদের জন্য চিকিৎসা ভিসা সহজ করার বিষয়েও চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

রোহিঙ্গা ও প্রতিরক্ষা সংলাপ

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সংলাপে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে চীন।

এ ছাড়া প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে নিয়মিত সংলাপ চালুর বিষয়ে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

ব্রিকস নিয়ে ইতিবাচক বার্তা

বাংলাদেশের ব্রিকসে যোগদানের আগ্রহকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। যদিও সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি, তবু চীনের এই সমর্থন বাংলাদেশের বহুমুখী অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

১৭টি সমঝোতা স্মারক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মধ্যে—

১৩টি সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে, ৩টি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও চীনা অংশীদারদের মধ্যে, এবং একটি বিএনপি ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে দলীয় পর্যায়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে। বিশ্লেষণ

চীনের প্রস্তাবিত বাংলাদেশ-মিয়ানমার-চীন অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের জন্য গত এক দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কানেক্টিভিটি উদ্যোগে পরিণত হতে পারে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার সুযোগ পাবে এবং দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের মধ্যে সরবরাহ শৃঙ্খলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবায়নের পথে রয়েছে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পের অর্থনৈতিক টেকসইতা গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। ফলে করিডোরটি কেবল একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • বেইজিং

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন