মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক: রপ্তানির বিপর্যয়ের মুখে প্রস্তুত কি ঢাকা?

যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের মাথার ওপর ঝুলছে ৫০ শতাংশ শুল্কের খড়গ।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক: রপ্তানির বিপর্যয়ের মুখে প্রস্তুত কি ঢাকা?

৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক যুক্ত হলে আগে থেকেই থাকা গড় শুল্ক ১৫ শতাংশ মিলিয়ে মোট শুল্কভার দাঁড়াবে ৫০ শতাংশে—যা বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পসহ রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিকে বড় ধাক্কা দিতে পারে।

নতুন এই শুল্ক ১ আগস্ট থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকলেও তার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির সুযোগ রয়েছে। তবে তিন মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার মুখে এসেও বাংলাদেশের আলোচনার গতি হতাশাজনক বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকেরা।

ট্রাম্পের নতুন ঘরানার শুল্কনীতি -

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ নীতির নতুন সংস্করণ ঘোষণা করেন। তার অংশ হিসেবে পাল্টা শুল্ক চালু করা হয়— যে দেশ আমদানি বাজারে যুক্তরাষ্ট্রকে সুবিধা না দেয়, তাদের রপ্তানিপণ্যে শুল্ক বসানো হবে।

গত ৭ এপ্রিলের নির্বাহী আদেশে এই নীতি কার্যকর হয়। তাতে বলা হয়, প্রতিটি দেশের সঙ্গে যেভাবে আমদানি-রপ্তানি ভারসাম্য গড়ে ওঠে, সেই ভিত্তিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে।

বাংলাদেশের জন্য কেন এতটা গুরুতর? যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একক বৃহৎ রপ্তানি গন্তব্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে যুক্তরাষ্ট্রে—যার ৮৫ শতাংশ তৈরি পোশাক।

পোশাকের দাম অত্যন্ত সংবেদনশীল। ১০–১৫ শতাংশ দাম বাড়লেই ক্রেতারা অন্য উৎসে সরে যেতে পারেন। ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে মার্কিন ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতে নিরুৎসাহিত হবেন।

ইইউতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, তখন সবার নজর পড়বে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে। ফলে ইউরোপের ক্রেতারা অতিরিক্ত ক্ষমতা দেখিয়ে দর কমিয়ে দিতে চাইবেন।

কোন কোন দেশ একই শিকার?

ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্কনীতির আওতায় পড়েছে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, কাজাখস্তানসহ ১৪টি দেশ। ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক নির্ধারিত হয়েছিল, দর-কষাকষিতে এখন তা কমে এসেছে ২০ শতাংশে। ভারতের সঙ্গে চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ২৫ শতাংশ হারে শুল্ক নির্ধারিত হয়েছে। আর বাংলাদেশ এখনো আলোচনার প্রাথমিক পর্যায়েই রয়েছে।

ঢাকার কূটনৈতিক ব্যর্থতা? বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বর্তমানে ওয়াশিংটনে আছেন। তবে মাত্র এখনই আনুষ্ঠানিক বৈঠক হচ্ছে। অথচ যুক্তরাজ্য, ভিয়েতনাম অনেক আগেই আলোচনা শুরু করে শুল্ক হার কমাতে সক্ষম হয়েছে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকেরা বলছেন, তিন মাস আগে যখন পাল্টা শুল্কের প্রাথমিক ঘোষণা আসে, তখনই জরুরি কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করা উচিত ছিল।

শিল্প মালিকেরা বলছেন কী?

চট্টগ্রামের ডেনিম এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তাফিজ উদ্দিন বললেন— “রপ্তানিতে ধস নামবে। এই পরিমাণ শুল্ক দিয়ে মার্কিন ক্রেতারা আর আগ্রহী হবেন না। এমনকি ইইউ বাজারেও অস্থিরতা ছড়াবে।”

শুল্কের হার কেমন ছিল, এখন কী হবে?

পূর্ববর্তী গড় শুল্ক (২০২৪ সালের তথ্য) ১৫% নতুন পাল্টা শুল্ক (ট্রাম্পের ঘোষণায়) ৩৫% মোট শুল্কহার (১ আগস্ট থেকে সম্ভাব্য) ৫০%।

তৈরি পোশাক ছাড়াও যেসব খাত ঝুঁকিতে: টুপি/ক্যাপ, চামড়ার জুতা, হোম টেক্সটাইল, পরচুলা ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য।

ভবিষ্যৎ করণীয় কী?

✅ শুল্ক মুক্ত বা প্রাধান্য পাওয়া বাজার খোঁজা দরকার।

✅ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার গতি বাড়াতে হবে।

✅ ‘জিএসপি প্লাস’-এর মতো সুবিধা ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিতে হবে।

✅ যুক্তরাষ্ট্রে লবিয়িং বাড়াতে হবে—তৈরি পোশাক শিল্পের পক্ষ থেকে সমন্বিত প্রচার দরকার।

বাংলাদেশ যদি ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে দর-কষাকষিতে ব্যর্থ হয়, তবে ৫০ শতাংশ শুল্কের বোঝা দেশের অন্যতম রপ্তানিখাতকে কঠিন অবস্থায় ফেলবে। এখনো সময় আছে—কূটনৈতিক তৎপরতা ও পররাষ্ট্র-বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই আঘাত এড়ানো সম্ভব। না হলে, তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি খাত বড় ধরনের ধসের মুখে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • বাংলাদেশ
  • যুক্তরাষ্ট্র
  • অর্থনীতিবিদ
  • পাল্টা শুল্ক
  • ট্রাম্প
  • শুল্কনীতি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন