মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

৪৬ বছর পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব: সংস্কারের সূচনা নাকি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ?

দীর্ঘ কয়েক দশক পর দেশের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে একযোগে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
৪৬ বছর পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব: সংস্কারের সূচনা নাকি রাজনৈতিক পরীক্ষার মঞ্চ?

সম্প্রতি ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এসব নিয়োগে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ায় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে এই সিদ্ধান্তকে শুধু রাজনৈতিক নিয়োগ হিসেবে দেখলে এর সম্ভাব্য প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্যের একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যাবে।

বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অর্থনীতি, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই অদক্ষ ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ধীরগতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং জবাবদিহির ঘাটতির কারণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বিভিন্ন সময় প্রশাসনিক মহলেও এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদকে তুলনামূলক কম গুরুত্বের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা ও কর্মদক্ষতায়।

যেসব প্রতিষ্ঠানে নতুন নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড, বাংলাদেশ জুট করপোরেশন, শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল), জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ নেতৃত্ব, সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে এসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের বিকাশ, রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও নীতিগত স্থবিরতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানই তাদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারেনি। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত চিনি শিল্প ও পাট খাতের আর্থিক সংকট সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকে অনেকে একটি সংস্কার উদ্যোগের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে দেখছেন। সরকারের প্রত্যাশা, নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে গতি আনবে এবং দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটাতে ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হলে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তরা যদি নিজেদের দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও কর্মক্ষমতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হন, তাহলে এর ইতিবাচক প্রভাব শিল্প, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে। তবে সেই মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তব কর্মদক্ষতা, আর্থিক ফলাফল এবং জনসেবার মানোন্নয়ন।

একটি নির্বাচিত সরকারের সাফল্য শুধু মন্ত্রিসভার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করে না। প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ নিজ সাংবিধানিক দায়িত্বের আওতায় থেকে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হয়।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্গঠন প্রয়োজন—তবে সেই পুনর্গঠনের ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা, জবাবদিহি এবং সুশাসনের নীতিমালা। সাম্প্রতিক নিয়োগগুলো যদি সত্যিই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি বৃহত্তর সংস্কার পরিকল্পনার অংশ হয়ে থাকে, তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কর্মদক্ষতা, সরকারের নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং ফলভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন