মূল সংবাদে যান
অপরাধ

দাবি আদায়ের নতুন কৌশল ‘ব্লকেড’!

দাবি আদায়ের নতুন কৌশল ‘ব্লকেড’! সড়ক অবরোধে জনদুর্ভোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সড়ক অবরোধের মাধ্যমে দাবি আদায় এখন যেন রুটিন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দাবিতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে, নগরবাসী পড়েন তীব্র ভোগান্তিতে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
দাবি আদায়ের নতুন কৌশল ‘ব্লকেড’!

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) পাঁচ দফা দাবিতে রাজধানীর ফার্মগেটে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করেন বিজ্ঞান কলেজের শিক্ষার্থীরা। তাদের ‘ব্লকেড’ কর্মসূচির কারণে প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে।

এক বছরের ব্যবধানে ১,৬০৪টি ব্লকেড—এ সংখ্যাই বলে দেয় আন্দোলন সংস্কৃতি এখন কোন পথে যাচ্ছে। আন্দোলন গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু জনজীবনকে জিম্মি করে তা চালানো—দেশের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব আন্দোলনের সূত্রপাত মঙ্গলবারের (২১ অক্টোবর) এক দুর্ঘটনা থেকে—ফার্মগেটে ট্রাকচাপায় নিহত হয় মাদ্রাসাছাত্র সিফাত। সেই ঘটনার বিচার দাবি ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে আসে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের ভঙ্গুর পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেয় একের পর এক দাবিনির্ভর আন্দোলন। দাবি আদায়ের মূল হাতিয়ার হয়ে ওঠে সড়ক অবরোধ বা ব্লকেড কর্মসূচি।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ১২৩টি সংগঠন মোট ১,৬০৪ বার সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেছে। এ তথ্য জানানো হয় ৩১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে, উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর ব্রিফিংয়ে। সে হিসেবে গড়ে প্রতিদিন ব্লকেড হয়েছে ৪ বারেরও বেশী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, “এই দেশে আন্দোলন মানেই সড়ক অবরোধ। জনগণকে জিম্মি না করলে আন্দোলন সফল হয় না—এমন ধারণা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই নীতি থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ধরুন, স্বামী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে নিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন, পথে ব্লকেড। লেবার পেইনে ছটফট করছে স্ত্রী, কিন্তু কেউ সাহায্য করতে পারছে না। এই বাস্তবতাই আমাদের ভাবিয়ে তুলছে।”

তাঁর মতে, সমাধান সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, নাগরিক সমাজ—সবাইকে আলোচনায় বসতে হবে। আন্দোলন হতেই পারে, তবে নির্দিষ্ট জায়গায়, নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হতে হবে।

সাম্প্রতিক ব্লকেডে দেখা যায়, অক্টোবরেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা ২০ শতাংশ বাড়িভাতা বৃদ্ধিসহ তিন দফা দাবিতে শাহবাগে আড়াই ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করেন। পরে পুলিশের লাঠিপেটা ও জলকামান ব্যবহারের পর আন্দোলন স্থগিত হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই সরকার তাদের দাবি মেনে প্রজ্ঞাপন দেয়।

একদিন পরই (২২ অক্টোবর) ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে ব্লকেডে বসেন শিক্ষকরা। এতে আবারও যান চলাচল বন্ধ হয়ে নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়ে।

এর আগে জানুয়ারিতেও একই দাবিতে শাহবাগ অবরোধ করেন ইবতেদায়ি শিক্ষকরা। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয়করণের ঘোষণা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন না হওয়ায় তারা পুনরায় রাস্তায় নামেন।

ডিএমপির কর্মকর্তারা জানান, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দাবিতে কেউ না কেউ রাস্তায় বসে পড়ছেন। রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ আলম বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই রমনা ডিভিশন আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু। সচিবালয়, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, হাইকোর্ট—সব আন্দোলনের মূল কেন্দ্র এখানেই।”

তিনি আরও বলেন, “আন্দোলনকারীরা মনে করেন, সড়ক অবরোধ ও জনভোগান্তি ছাড়া তাদের দাবি পূরণ হয় না। ফলে পুলিশেরও প্রতিদিনই চাপ সামলাতে হয়।”

অটো পাসের দাবিতে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের সচিবালয় ঘেরাও, চাকরিচ্যুত পুলিশ সদস্যদের পুনর্বহালের আন্দোলন, আনসার সদস্যদের বিদ্রোহ, রিকশাচালক ও রেলশ্রমিকদের বিক্ষোভ—সব ক্ষেত্রেই দাবি আদায়ের মাধ্যম একই: সড়ক ব্লকেড।

ঢাকা কলেজ বনাম সিটি কলেজ সংঘর্ষ, শাহবাগে সংখ্যালঘুদের আট দফা আন্দোলন, পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের ছয় দফা, চিকিৎসকদের বেতন বাড়ানোর দাবি—সবক্ষেত্রেই শহরের প্রাণকেন্দ্র অবরুদ্ধ থেকেছে।

ব্লকেড চলাকালীন সময়ে রাজধানীতে যানজটের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নেয়। কোনো সড়ক দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকলে পুরো ঢাকা শহরই অচল হয়ে পড়ে।

একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এখন নির্বাচন সামনে। পুলিশ অপরাধ দমন, নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। এর মধ্যে আবার ব্লকেডের পর ব্লকেড শুরু হলে পুরো শহর স্থবির হয়ে পড়বে।”

সম্পর্কিত বিষয়

  • ব্লকেড

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন