মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

আমিন জুট মিল: এক ‘মৃত’ শিল্পের অনিশ্চয়তা ও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি

যেখানে হাজারো শ্রমিকের কোলাহলে মুখর ছিল চারদিক, যেখানে উৎপাদিত হতো বাংলাদেশি ‘সোনালি আঁশে’ তৈরি বিখ্যাত কার্পেট, বস্তা ও রপ্তানি পণ্য— ১৭১ একর বিস্তৃত সম্পদের সেই আমিন জুট মিল এখন মৃতপ্রায়।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
আমিন জুট মিল: এক ‘মৃত’ শিল্পের অনিশ্চয়তা ও ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি

প্রায় পাঁচ বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা দেশের অন্যতম প্রাচীন এই পাটকল আজ শুধু অতীতের স্মৃতিচারণের একটি বেদনার ক্ষেত্র হিসেবে পরিণত হয়েছে। বিদেশী ক্রেতার পরিবর্তে স্থানীয়দের খুঁজে পাওয়া এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে খরচের পরিধি গত ৫ বছরে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি টাকার বেশি।

আমিন জুট মিল শুধু একটি বন্ধ কারখানা নয়—এটি বাংলাদেশের শিল্পনীতির ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা, এবং রাজনৈতিক উদাসীনতার প্রতীক। এই মিলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা যেমন রাষ্ট্রের অবজ্ঞা, তেমনি এটিকে কেন্দ্র করে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে—দেশ কি তার নিজস্ব সম্ভাবনা ও সম্পদ সংরক্ষণে ইচ্ছুক? নাকি ইতিহাসের পাতায় আরেকটি শিল্পের মৃত্যু ঠাঁই করে দেবে?

পাটশিল্পের পাটাতন ভেঙে পড়ার ইতিহাস ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানি নাগরিক ‘আমিন সাহেব’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই মিল। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এটি জাতীয়করণ করে সরকার। একসময় আমিন জুট মিল ছিল দেশের রপ্তানি আয় বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি। তৈরি হতো কার্পেট, কম্বল, চর্টের বস্তা, এমনকি জায়নামাজও। বিশেষ করে ইরাক ও ইরান ছিল অন্যতম বড় ক্রেতা। ঢাকা-বাগদাদ বাণিজ্য সম্পর্কে এই মিলের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ তার কিছুই অবশিষ্ট নেই।

২০২০ সালের ১ জুলাই, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোষণায় বন্ধ হয়ে যায় দেশের সব রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের মতোই আমিন জুট মিল। সরকারি উদাসীনতা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও গোপন স্বার্থের জাল যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাকৃতিক ফাইবার ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে, সেখানে পাটশিল্পকে ধ্বংস করে দেওয়া কেবল অর্থনৈতিক ভুল নয়—এটি একটি রাজনৈতিক অপরাধ বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতারা। তাদের অভিযোগ, “দলীয় কিছু শিল্পপতি ও ভারতের স্বার্থে পাটশিল্পকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয়েছে।” সাবেক বস্ত্রমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজীকে পাটশিল্প ধ্বংসে “শেষ পেরেক ঠোকা ব্যক্তি” হিসেবেও অভিহিত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে অভিযোগ রয়েছে—পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্তে আসলে মুনাফার ক্ষতির অজুহাত ছিল অজান্তে দেশের সম্পদ ও বাজার হস্তান্তরের ছক। ‘বন্ধ’ মিলেও খরচ চলমান মিলটি পাঁচ বছর ধরে বন্ধ থাকলেও এখনো সেখানে কর্মরত ৪৫ জন কর্মকর্তা ও আনসার বাহিনীর সদস্যসহ আরও অনেকে আছেন। প্রতি মাসে সরকারকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা বেতন ও নিরাপত্তা খাতে, যা ৫ বছরে দাঁড়িয়েছে ৩৬ কোটি টাকার বেশি। তবে সেই টাকা আসছে না কোনো আয় থেকে। পুরোনো যন্ত্রপাতির স্ক্র্যাপ বিক্রি, ক্লাব-দোকান ভাড়া ইত্যাদি থেকে সামান্য আয় হলেও মূল অর্থ ধার-দেনা করে মেটানো হচ্ছে—যা পুরো পরিস্থিতিকে একটি অব্যবস্থাপনার প্রতীক বানিয়ে তুলেছে।

amin jute mill.jpg

সম্পত্তি রক্ষা না করলে শিল্প নয়, হবে দখলবাজদের আখাড়া - ৮১ একর জমির ওপর স্থাপিত মিলটির ছিল ১৭১ একর পর্যন্ত বিস্তৃত সম্পদ। তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। এখনও যে বিপুল জমি পড়ে আছে—তার ওপর ‘চোখ’ পড়েছে প্রভাবশালীদের। চট্টগ্রামের মত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে এই মূল্যবান জমি বেদখলের হুমকিতে, মিল কর্মকর্তারা পর্যন্ত শঙ্কিত। উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পুনরুদ্ধার ও নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রমে এই সম্পদ ব্যবহারে সরকারি উদ্যোগ না নিলে এটি হবে ভবিষ্যতের আরেকটি ভূমিদস্যু দখলের ‘কেস স্টাডি’।

বিকল্প রাষ্ট্রীয় পুনর্জাগরণ, নাকি বেসরকারিকরণ? বর্তমানে কিছু কর্মকর্তা দাবি করছেন, যারা কাজ না করেও বসে বসে বেতন নিচ্ছেন—তাদের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন অন্যান্য সংস্থায় আত্মীকরণ করলে দক্ষ মানবসম্পদের অপচয় রোধ হবে। পাশাপাশি অনেকেই বলছেন, মিলগুলো আধুনিকায়ন করে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে পুনরায় চালু করা সম্ভব। চাই সুশাসন, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আধুনিক প্রযুক্তি।

শ্রমিকদের দাবি, বিজেএমসি-এর (বাংলাদেশ জুট মিল করপোরেশন) মাধ্যমে নতুন করে সংস্কার ও চালুর উদ্যোগ নিলে আবারও হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, পাটচাষিরাও উপকৃত হবেন। শেষ প্রদীপটিও নিভু নিভু ভারত সম্প্রতি স্থলপথে বাংলাদেশের পাটের কাঁচামাল আমদানি বন্ধ ঘোষণা করেছে। ফলে দেশীয় পাটচাষিরাও চরম সংকটে। দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা নেই, আবার কারখানাগুলোও বন্ধ। এ অবস্থায় পাটশিল্পের প্রদীপটি নিভে যেতে আর বেশি সময় নেই, যদি এখনই রাষ্ট্র নীতিগত সিদ্ধান্ত না নেয়।

সম্পর্কিত বিষয়

  • আমিন জুট মিল
  • পাটকল
  • বিজেএমসি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন