জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান অচলাবস্থার জেরে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা এ পরিস্থিতিকে ‘জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টার সক্রিয় হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পখাতের শীর্ষ সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, গত ১৪ মে থেকে এনবিআরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কলম বিরতি পালন করছেন। তবে আজ থেকে কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে, যার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে আমদানি-রপ্তানি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমে।
শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতাদের উদ্বেগ
সংবাদ সম্মেলনে আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান, বিএসআইসির সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পেয়ারভেজ), বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু, বিটিএমএর শওকত আজিজ রাসেল, বিকেএমইএর ফজলে শামীম এহসান, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশনের সৈয়দ নাসিম মনজুর এবং ডিএসসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।
তারা বলেন, “চলমান অচলাবস্থার ফলে আমাদের তৈরি পোশাক, চামড়া, সিরামিকস, ওষুধ, কৃষিপণ্য ও প্লাস্টিক খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শীতকালীন মৌসুমে কার্যাদেশের ভিড়ে রপ্তানিকারকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। অথচ বন্ড কমিশনারেট ও কাস্টমস হাউস কার্যত অচল।”
অর্ডার বাতিলের হুমকি, বাজার হারানোর শঙ্কা
ব্যবসায়ীরা জানান, অনেকে সময়মতো পণ্য রপ্তানি করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা কার্যাদেশ বাতিলের হুমকি দিচ্ছেন। নতুন অর্ডারও আসা বন্ধ হয়ে গেছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি প্রতিবেশী দেশের কাছে বাজার হারানোর শঙ্কাও বাড়ছে।
তারা বলেন, “আন্তর্জাতিক বাজার আমাদের জন্য অপেক্ষা করবে না। অর্ডার যদি প্রতিবেশী দেশে চলে যায়, তা হলে তা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়াবে।”
ডেমারেজ বেড়ে ৪ গুণ, বেড়েছে খরচও
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, এনবিআরের অচলাবস্থার কারণে বন্দরে পণ্য ছাড় করতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে ডেমারেজ বা জরিমানার পরিমাণ আগের তুলনায় চার গুণ বেড়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় ব্যবসায়িক ব্যয় কাঠামোকে অস্বাভাবিকভাবে ভারী করে তুলছে।
‘চেয়ারম্যান অপসারণ নয়, সমাধান চাই আলোচনায়’
ব্যবসায়ী নেতারা এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের বিরোধিতা করে বলেন, “গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে থেকে কেউ আন্দোলনে অংশ নিতে পারেন না। কিন্তু সংকটের মূলে না গিয়ে শুধুই অপসারণে মনোযোগ দেওয়া সমাধান নয়। আলোচনার মাধ্যমেই এই জট খুলতে হবে।”
চাহিদা ও আহ্বান
নেতারা প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়ে বলেন, এই সংকট নিরসনে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিডাকেও আলোচনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে এনবিআরের আন্দোলনরত কর্মীদের যৌক্তিক দাবিগুলোর ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে যাতে আর কখনো এমন অচলাবস্থার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
ব্যবসায়ীদের ৪ দফা দাবি: ১. আমদানি-রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে এনবিআরের সঙ্গে জরুরি বৈঠক। ২. বিতর্কিত অধ্যাদেশ পর্যালোচনা করে বাস্তব ও আন্তর্জাতিক মানের সমন্বয়। ৩. ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতে সরকারি দপ্তরের জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি। ৪. এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার কর্মসূচির বাস্তবায়ন।
