জাহাজভাঙা ইয়ার্ডে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে মৃত্যুহার শূন্যে নামিয়ে আনার ওপর জোর দিয়েছেন শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব রাশেদুল ইসলাম।
তিনি বলেছেন, শিল্পায়নের সঙ্গে ঝুঁকি থাকবেই। তবে সেই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন হয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। আগামী দিনে জাহাজভাঙা শিল্পে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
শনিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের হোটেল আগ্রাবাদে ‘বাংলাদেশে টেকসই জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিষয়ক নিরাপত্তা সচেতনতা কর্মসূচি—মারাত্মক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সেইফটি অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম অন সাসটেইনেবল শিপরিসাইক্লিং ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন।
জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে অতিরিক্ত সচিব রাশেদুল ইসলাম বলেন, আধুনিক যুগে ঘরে বসেই ক্যামেরার মাধ্যমে শিল্পকারখানার ইয়ার্ড পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। তিনি বলেন, এখন খুব কম খরচেই ক্যামেরা পাওয়া যায়। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে মোবাইল ফোন থেকেই ইয়ার্ডের পরিস্থিতি দেখা সম্ভব। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কোথায় তৈরি হচ্ছে, তা আগেভাগেই শনাক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
তার ভাষায়, অভিজ্ঞতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে প্রযুক্তির সুবিধা নিতে হবে। বিশেষ করে যারা কোনো কাজের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন, তাদের আরও বেশি সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, শিল্পের উন্নয়ন সরকার চায়। একই সঙ্গে চায় এ শিল্পে মৃত্যুহার শূন্য হোক। কারণ বড় শিল্পের সম্ভাবনার সঙ্গে বড় দায়িত্বও রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, দেশের জাহাজভাঙা শিল্প পুরোনো হলেও এখন ধীরে ধীরে গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ড গড়ে উঠছে। প্রযুক্তিনির্ভর এ শিল্পে সামান্য অসতর্কতাও বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনতে পারে। তিনি বলেন, ‘শিল্প যান্ত্রিক দানবের মতো। একটু অসতর্ক হলে বিপদ।’ তবে এ শিল্পকে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব করার জন্য সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। ভবিষ্যতে এ শিল্পে ‘জিরো ক্যাজুয়ালিটি’ বা শূন্য দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিভাগীয় কমিশনার আরও বলেন, সরকারের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে জাহাজভাঙা শিল্পে নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও কার্যকর হবে বলে তিনি আশা করেন।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, গ্রিন শিপ ইয়ার্ডে আগের তুলনায় ঝুঁকির পরিমাণ কমেছে। তবে সাম্প্রতিক একটি দুর্ঘটনা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে শিল্পসংশ্লিষ্টদের। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাটির জন্য তারা দুঃখিত। এ ধরনের ঘটনার জন্য তাদের কোনো ধরনের মানসিক প্রস্তুতি ছিল না। ঘটনাটি তাদের জন্য নতুন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, এর আগে দুটি ব্যালাস্ট ট্যাংক কাটা হলেও কোনো ধরনের বিপদ ঘটেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় নতুন শিক্ষা পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য কীভাবে কাজ করতে হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। শিল্প মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য গভর্নিং বডি তাদের সহযোগিতা করছে। বর্তমান সরকারের সহযোগিতা ভবিষ্যতে আরও নিরাপদভাবে শিপ রিসাইক্লিং করার পথ তৈরি করছে।
জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত দায় শুধু জাহাজভাঙা ইয়ার্ডের ওপর নয়—জাহাজ নির্মাতাদেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে উল্লেখ করেন বিএসবিআরএ সভাপতি। তিনি বলেন, জাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) কিছু নীতিমালা রয়েছে।
একটি জাহাজ নির্মাণের সময়ই বিবেচনা করা উচিত, ২০ থেকে ২৫ বছর পর সেটি কোথায় রিসাইকেল করা হবে এবং যে রিসাইক্লিং ফ্যাসিলিটিতে নেওয়া হবে সেটি পরিবেশবান্ধব কি না। অর্থাৎ একটি জাহাজের জীবনচক্রের শেষ ধাপের দায়িত্বও জাহাজ নির্মাণ ও মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নির্মাতাদের ওপরও কিছু দায়ভার রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চট্টগ্রামের উপকূলীয় অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা জাহাজভাঙা শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দুর্ঘটনা, শ্রমিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। সেই বাস্তবতায় গ্রিন শিপ রিসাইক্লিংয়ের দিকে এগোনোর পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
কর্মশালায় উঠে আসা বক্তব্যগুলোতে মূলত তিনটি বিষয় সামনে এসেছে—প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নিরাপত্তা সচেতনতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার আধুনিকায়ন। সরকারের পক্ষ থেকে বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনাময় শিল্প হিসেবে জাহাজভাঙা খাতের বিকাশের কথা বলা হলেও সেই বিকাশের শর্ত হিসেবে নিরাপত্তাকে সামনে রাখা হয়েছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যেও সাম্প্রতিক দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
ফলে আগামী দিনের জাহাজভাঙা শিল্পের বড় প্রশ্ন শুধু কত টাকার ব্যবসা হবে—তা নয়; কতটা নিরাপদে, কতটা পরিবেশবান্ধব এবং কতটা প্রযুক্তিনির্ভরভাবে সেই ব্যবসা করা যাবে—সেটিই হয়ে উঠছে মূল চ্যালেঞ্জ।