মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

¯^নির্ভর চসিকের পথে ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বাজেট

চট্টগ্রাম মহানগরকে একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ, ¯^াস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ নগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ২ হাজার ২৬০ কোটি ২৪ লাখ টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)|

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
¯^নির্ভর চসিকের পথে ২ হাজার ২৬০ কোটি টাকার বাজেট

নতুন বাজেটে অবকাঠামো উন্নয়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, রাজ¯^ বৃদ্ধি, ডিজিটাল নাগরিক সেবা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ¯^াস্থ্যসেবা এবং আয়বর্ধক প্রকল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে|

মঙ্গলবার নগরীর থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম (টিআইসি) মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেট অধিবেশনে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বাজেট ঘোষণা করেন| একই সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ হাজার ৬৬৫ কোটি ৯২ লাখ ১৬ হাজার ৪০০ টাকার সংশোধিত বাজেটও উপস্থাপন করা হয়| মূল বাজেট ছিল ২ হাজার ১৪৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা| সে হিসাবে বাস্তবায়নের হার প্রায় ৭৮ শতাংশ|

বাজেট বক্তব্যে মেয়র বলেন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে আর্থিকভাবে ¯^নির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই তাঁর প্রধান লক্ষ্য| দায়িত্ব গ্রহণের সময় করপোরেশনের মোট দেনা ছিল ৫৯৬ কোটি টাকা| মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে সেই দেনা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮০ কোটি টাকায়| সদিচ্ছা থাকলেও আর্থিক সক্ষমতা ছাড়া নগরবাসীর প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব নয়| তাই নাগরিক সেবার মান বাড়াতে হলে করপোরেশনের নিজ¯^ আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই|

চলতি অর্থবছরে চসিক সরকারি কোষাগারে আয়কর বাবদ ৪৭ কোটি ৭৩ লাখ এবং ভ্যাট বাবদ ৮৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকা জমা দিয়েছে| পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আনুতোষিক ও ভবিষ্যৎ তহবিলের বকেয়া পরিশোধেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে|

রাজ¯^ আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মেয়র বলেন, নতুন বাজেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজ¯^ আদায়ে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা| ১২ জুলাই থেকে "আমাদের চট্টগ্রাম" নামে ওয়ান-স্টপ সিটিজেন সার্ভিস অ্যাপ চালুর ঘোষণা দিয়েছি|

এই অ্যাপের মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই— হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ, বিভিন্ন সেবার আবেদন, অভিযোগ দাখিল, সেবার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন| এছাড়া হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ে আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হচ্ছে, যাতে কর নির্ধারণ ও আদায়ে ¯^চ্ছতা নিশ্চিত হবে|

ট্রেড লাইসেন্সে বড় অভিযান পরিচালিত হবে| চট্টগ্রামে প্রায় ১০ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকলেও ˆবধ ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে দেড় লাখেরও কম| এই বিশাল ব্যবধান কমাতে ট্রেড লাইসেন্সের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে চসিক| কোচিং সেন্টার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞাপন খাত থেকেও নিয়মিত রাজ¯^ আদায়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে| একই সঙ্গে বন্দর, রেলওয়ে, কনটেইনার টার্মিনাল, অয়েল কোম্পানি এবং বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের বকেয়া রাজ¯^ আদায়ে কঠোর অবস্থানের কথাও জানিয়েছেন মেয়র|

অবকাঠামো উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে জোর দেওয়া হবে জানিয়ে মেয়র বলেন, চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধানে ড্রেনেজ উন্নয়নকে বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে| ১৯টি খাল থেকে ৪১ লাখ ঘনফুট মাটি ও আবর্জনা অপসারণ করা হয়েছে| ড্রেনেজ উন্নয়নে ইতোমধ্যে ১৪৮টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে| বর্ষা মৌসুমে আরও ২০০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে|

জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রামের পানি জমার সমস্যা দূর করতে এবার ১১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে| গত বছর এই খাতে বাজেট ছিল ৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছিল ৬৫ কোটি টাকা| অর্থাৎ, এবার এই খাতে বরাদ্দ প্রায় ৩৭ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে|

মশা মারার কার্যক্রম আরও জোরদার করতে এবার ২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে| গত বছর এই খাতে মাত্র ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল এবং খরচ হয়েছিল ৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা| সেই তুলনায় এবার মশা নিধনে প্রায় তিন গুণ বেশি টাকা খরচ করা হবে|

এছাড়া মশক নিয়ন্ত্রণে প্রথমবারের মতো লার্ভিসাইড ব্যবহার শুরু হয়েছে| নগরের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে দক্ষিণ পাহাড়তলীতে ১০ একর জমি ক্রয় করা হয়েছে| সেখানে আধুনিক বর্জ্য শোধনাগার (ডধংঃব ঞৎবধঃসবহঃ ঋধপরষরঃু) নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে| অন্যদিকে কুলগাঁও এলাকায় বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণকাজও এগিয়ে চলছে, যা নগরের যানজট কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে চসিক|

¯^াস্থ্যসেবায় নতুন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে| বিএফআইডিসি সড়কে চসিকের মালিকানাধীন প্রায় ৮ একর জমি এওয়াজ বদলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথাও বাজেটে তুলে ধরা হয়েছে| এছাড়া নগরের ¯^াস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে| নিজ¯^ আয় বাড়াতে চসিক ৪৪টি আয়বর্ধক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে|

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর টেকসই অর্থায়নের জন্য সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্যিক সম্পদের উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজ¯^ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| নতুন বাজেটে সেই দিকেই জোর দেওয়া হয়েছে|

মেয়র অভিযোগ করেন, বন্দরের ভারী ট্রাক নগরের সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে| তার মতে, ১০ টন ধারণক্ষমতার সড়কে ২০ থেকে ৩৫ টন ওজনের যানবাহন চলাচল করায় প্রতিবছর অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার করতে হচ্ছে| তিনি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন| গৃহকর নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ বিবেচনায় নিয়ে নিয়মিত রিভিউ বোর্ড পরিচালনার কথা জানিয়েছেন মেয়র| তিনি বলেন, অতীতে অযৌক্তিকভাবে নির্ধারিত কর পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে| তবে কর ফাঁকি নয়, ন্যায়সংগত কর প্রদান নিশ্চিত করতে হবে|

বাজেটে উল্লেখ করা হয়েছে, চসিক প্রতিষ্ঠিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়কে পুনরায় করপোরেশনের অধীনে এনে ট্রাস্টি বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে| বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে|

বাজেটের মূল চিত্র- ২০২৬-২৭ প্রস্তাবিত বাজেটে ২ হাজার ২৬০.২৪ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ সংশোধিত বাজেটে ১ হাজার ৬৬৫.৯২ কোটি টাকা, ২০২৫-২৬ মূল বাজেটে ২ হাজার ১৪৫.৪২ কোটি টাকা, বাস্তবায়নের হার ৭৮ শতাংশ| এছাড়া দায়িত্ব গ্রহণকালে দেনা ৫৯৬ কোটি টাকা, বর্তমান দেনা ৩৮০ কোটি টাকা, আয়কর প্রদান ৪৭.৭৩ কোটি টাকা, ভ্যাট প্রদান ৮৬.৭৪ কোটি টাকা, আয়বর্ধক প্রকল্প ৪৪টি, পরিষ্কার করা খাল ১৯টি, অপসারিত মাটি-আবর্জনা ৪১ লাখ ঘনফুট, বাস্তবায়িত ড্রেনেজ প্রকল্প ১৪৮টি, নতুন পরিকল্পিত ড্রেনেজ প্রকল্প ২০০টি|

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের এবারের বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, এটি কেবল ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি আর্থিক পুনর্গঠন, রাজ¯^ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর নগর ব্যবস্থাপনার একটি রূপরেখা| একদিকে দেনা কমানোর প্রচেষ্টা, অন্যদিকে ডিজিটাল কর আদায়, ট্রেড লাইসেন্স সম্প্রসারণ, আয়বর্ধক প্রকল্প এবং নাগরিক সেবাকে অনলাইনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা—এসবই চসিককে ¯^নির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়|

তবে বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন, রাজ¯^ আহরণের সক্ষমতা, সরকারি সংস্থাগুলোর সমš^য় এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ওপর| বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসন, সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ডিজিটাল সেবার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই আগামী অর্থবছরে চসিকের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র হবে|

বাজেট অধিবেশনে মেয়রের সঙ্গে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন এবং প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির চৌধুরীসহ সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ|

সম্পর্কিত বিষয়

  • চসিক
  • বাজেট

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন