মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা চলমান ১৫ জনের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন তীব্র হবে

চট্টগ্রাম—নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
এনসিটি ইজারা বিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা চলমান ১৫ জনের বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন তীব্র হবে

জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানো-নামানো প্রায় বন্ধ, বন্দর থেকে খালাস হওয়া কনটেইনার পরিবহন ব্যাহত এবং বেসরকারি ডিপো থেকে বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী যান চলাচল তিনদিন ধরে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। অচলাবস্থা পরিস্থিতির আজ চতুর্থ দিনে ৮ ঘন্টা থেকে বাড়িয়ে ২৪ ঘন্টার ঘোষণা দিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারীরা।

Ctg-port.jpg

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারী) সকাল আটটা থেকে তৃতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি শুরু হলে বন্দরের জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটি—তিনটি টার্মিনালেই কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসে। এরইমধ্যে বেলা পৌনে একটায় বন্দর ভবন চত্বরে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর আজ মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি ঘোষণা করে।

মো. হুমায়ুন কবীর জানান, বন্দরের সর্বস্তরের কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। এতে বন্দর থেকে আমদানি পণ্যের ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, বন্দরের ভেতরে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ব্রিফিংয়ের সময় উপস্থিত ছিলেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহিম খোকন, আনোয়ারুল আজিম, ফরিদুর রহমান, শামসু মিয়া টুকু প্রমুখ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দরে কর্মরত সরকারি-বেসরকারি কোনো শ্রমিক-কর্মচারী নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী কাজে যোগ দেননি। বন্দরের জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) টার্মিনালে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এনসিটি ও চট্টগ্রাম কন্টেনার টার্মিনালে (সিসিটি) কিছু কার্যক্রম চললেও আন্দোলনের ফলে বন্দরের সার্বিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে দেখা গেছে। বন্দরের ইকুইপমেন্ট অপারেটর ও শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্দরের অভ্যন্তরে কন্টেনার এবং বহির্নোঙরে জাহাজের জট দেখা দেয়ারও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

শুধু এনসিটিতে সীমিত পরিসরে বেসরকারি ডিপো থেকে আনা রপ্তানি পণ্যবাহী কিছু কনটেইনার জাহাজে তোলার কাজ চলছে। যন্ত্রপাতির অপারেটররাও কাজে যোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে সল্টগোলা ক্রসিং পর্যন্ত এলাকায় গতকাল অপেক্ষমাণ প্রচুর গাড়ি দেখা গেছে। ওখানে স্ক্র্যাপবাহী গাড়ির দীর্ঘ জটও চোখে পড়েছে। বন্দরের গেটগুলো খোলা থাকলেও কর্মবিরতি চলাকালে কোনো গাড়ি ঢুকতে বা বের হতে দেখা যায়নি।

এদিকে সোমবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ১৫ কর্মচারীকে খুলনার মোংলা বন্দর ও পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আন্দোলনে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করা দুজনও রয়েছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব মো. বেলায়েত হোসেনের সই করা আদেশে দাপ্তরিক প্রয়োজনে বদলিপূর্বক সংযুক্তি প্রদান করার কথা জানানো হয়।

এর মধ্যে আটজনকে পায়রা বন্দরে এবং সাতজনকে মোংলা বন্দরে বদলি করা হয়েছে। এর আগে তিনটি পৃথক আদেশে এই কর্মচারীদের ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ডিপো ও কেরানীগঞ্জের পানগাঁও নৌ টার্মিনালে বদলি করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে তাঁরা এসব কর্মস্থলে যোগ দেননি। গতকাল সোমবার তাঁদের আবারও বদলি করে দুই বন্দরে সংযুক্তি প্রদান করা হলো।

চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেছেন, কর্মবিরতির মধ্যেও বন্দরে অপারেশনাল কার্যক্রম চলছে। আমাদের বন্দরে গত শনিবার প্রায় এক হাজার টিইইউএস কন্টেনার ডেলিভারি গেছে। রবিবারেও প্রায় ১৭০০ টিইইউএসের মতো ডেলিভারির অ্যাসাইনমেন্ট থাকায় কার্যক্রম চলমান। ভেতরে সবগুলো জাহাজের কার্যক্রম সহ ইয়ার্ডের কার্যক্রমও চলমান আছে। নিউমুরিং কন্টেনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘কিছুই করার নেই’। সরকার চুক্তি করলে বন্দর কর্তৃপক্ষ সেটা বাস্তবায়নে বাধ্য। তবে এ আন্দোলনের পেছনে বিশেষ মহলের ইন্ধন আছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার।

সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে এনসিটি ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করে আসছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। আন্দোলনের তৃতীয় দিন গতকাল সোমবারও সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত বন্দর কার্যক্রমে অচলাবস্থা ছিল। বদলি প্রত্যাহার ও ইজারা বাতিলের দাবিতে কাল মঙ্গলবার থেকে একটানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ।

এদিকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে বন্দর এলাকায় যেকোনো ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে শনিবার রাতে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হলেও শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। বন্দর এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। বন্দরের গেটগুলো খোলা থাকলেও কোনো পণ্যবাহী গাড়ি ভেতরে প্রবেশ করছে না, বেরও হচ্ছে না। অলস সময় কাটাতে দেখা গেছে নিরাপত্তারক্ষী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।

আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী নেতাদের বদলির ঘটনায় শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীরসহ আন্দোলনে জড়িত অন্তত ১৬ জন কর্মচারীকে ঢাকার পানগাঁও আইসিটি ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করেছে। কর্তৃপক্ষ বদলিকে ‘জরুরি দাপ্তরিক ও অপারেশনাল প্রয়োজনে’ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করলেও আন্দোলনকারীরা বলছেন, আন্দোলন নস্যাৎ করতেই এই সিদ্ধান্ত।

চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার প্রতিবাদে আমাদের ডাকা কর্মসূচিতে শ্রমিক-কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দিয়েছেন। সরকার যদি সিদ্ধান্ত বাতিল না করে, তাহলে আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন জানান, সিএমপির নিষেধাজ্ঞার কারণে বন্দর এলাকায় মিছিল-সমাবেশ না হলেও পূর্বঘোষিত কর্মসূচি যথারীতি পালন করা হচ্ছে। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আজ মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে একটানা ২৪ ঘণ্টার কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বদলির আদেশ প্রত্যাহার না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে।

তিন দিন ধরে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতির ফলে বন্দরে আটকে পড়ছে বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য। এতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। বন্দর জেটি ও টার্মিনাল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বার্থ অপারেটরস, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরস অ্যান্ড টার্মিনাল অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফজলে একরাম চৌধুরী বলেন, শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দেওয়ায় জিসিবি টার্মিনালে জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর কাজ প্রায় বন্ধ। শ্রমিক বুকিং দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। কর্মবিরতির প্রভাব পড়ে বন্দরের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও। সোমবার সকালে বন্দর ভবনের নিচতলায় বার্থিং সভা পণ্ড হয়ে যায়। সভায় অংশ নিতে আসা শিপিং এজেন্টদের আন্দোলনকারীরা কক্ষ ত্যাগ করতে বলেন।

এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ) বন্দর অভিমুখে কালো পতাকা মিছিল ও সমাবেশ করেছে। বেলা ১১টায় আগ্রাবাদ বাদামতলী মোড় থেকে শুরু হওয়া মিছিল যমুনা ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়। সমাবেশে নেতারা এনসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জোর দাবি জানান। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত সমাধান না এলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের এই অচলাবস্থা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য ও জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কৃত্রিম সংকট ও মূল্য অস্থিতিশীলতা দূর করতে চট্টগ্রাম বন্দরের বহিঃনোঙ্গরে যৌথ অভিযান চালিয়ে নিরাপত্তা জোরদার করেছে বলে জানান বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সিয়াম-উল-হক।

সিয়াম-উল-হক জানান, আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে চট্টগ্রাম বহিঃনোঙ্গরে বিভিন্ন লাইটার জাহাজে খাদ্যদ্রব্য মজুত করে রেখেছে বলে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জেনে আমরা অভিযান পরিচালনা করি। গতকাল রবিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত কোস্ট গার্ড বেইস চট্টগ্রাম, নৌ পরিবহন অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দরের সমন্বয়ে মোট ২৭টি বাণিজ্যিক ও লাইটার জাহাজে যৌথ অভিযান চালানো হয়। এ সময় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধ ও মূল্য স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চট্টগ্রাম বন্দর ও বহিঃনোঙ্গর এলাকায় কোস্ট গার্ডের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা ও নজরদারি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বন্দরের নির্দেশনা অনুযায়ী ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় কোনো লাইটার, কোস্টার, অয়েল ট্যাংকারসহ খাদ্যদ্রব্য ও ভোজ্য তেলবাহী জাহাজকে নোঙর এলাকায় অবস্থান করতে দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি ভোজ্য তেলবাহী জাহাজগুলোকে দ্রুত নিজ নিজ গন্তব্যে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা হচ্ছে। আইন অমান্যকারী জাহাজের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। জনস্বার্থে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধে ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • এনসিটি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন