কফি ও কাজুবাদামের নতুন আবাদ যেন এই অনগ্রসর পার্বত্য অঞ্চলে অর্থনৈতিক মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ে আজ অনেকেই বলছেন—‘এটাই হতে পারে আমাদের ভাগ্যবদলের ফসল।’
সরকারি উদ্যোগে তিন পার্বত্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে কফি ও কাজুবাদামের বাগান। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি কৃষি প্রকল্প নয়, এটি পাহাড়ি জীবনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত সুপ্রদীপ চাকমা জানান, “এটি একবারের প্রকল্প নয়—আগামী ৪০-৫০ বছর ধরে এই চাষ পাহাড়ি কৃষকদের স্থায়ী আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। যেভাবে সিলেটকে চায়ের জন্য চেনে বিশ্ব, আমরা চাই পার্বত্য চট্টগ্রামকে চিনুক কফি আর কাজুবাদামের জন্য।”
বর্তমানে প্রায় ৪২০০ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম এবং ১৮০০ হেক্টরে কফি চাষ হচ্ছে। চাষের বিস্তার ঘটেছে মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে। উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ২ হাজারেরও বেশি বাগান ইতিমধ্যে সৃজন করা হয়েছে।
উৎপাদন বাড়ছে, সম্ভাবনা বিস্তৃত হচ্ছে কৃষিবিদ ও প্রকল্প পরিচালক ড. মো. জসিম উদ্দিন জানালেন,“বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলায় প্রায় ৫ লাখ হেক্টর অনাবাদি জমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ হেক্টরে কফি চাষ করলে বছরে দুই লাখ টন কফি উৎপাদন সম্ভব। এছাড়া কাজুবাদামও আন্তর্জাতিক বাজারে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন।”
পার্বত্য অঞ্চলের ৯২ শতাংশ ভূমিই উঁচু—পানি জমে না, যা কফি ও কাজুবাদামের মতো ফসলের জন্য আদর্শ। অন্য ফল বাগানগুলোর ছায়াতেও সহজে কফি গাছ বেড়ে ওঠে, ফলে বাড়তি জমিরও প্রয়োজন পড়ে না।
রপ্তানি সম্ভাবনা ও শিল্পায়নের ছাপ সরকারি হিসাব বলছে, প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে দেশে ২২টি কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে উঠেছে, এবং বড় শিল্পগোষ্ঠী যেমন বিএসআরএম ও কাজী গ্রুপ রপ্তানিমুখী কারখানা স্থাপন করছে।
এতে করে পাহাড়ে তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা, শিল্পাঞ্চল ও নারীশ্রমিকসহ প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। বর্তমানে দেশের বাজারেই প্রায় ৭০০ কোটি টাকার কাজুবাদাম এবং ৬০০ কোটি টাকার কফি বিক্রি হচ্ছে।
অগ্রগতির পথে বাধাও রয়েছে তবে সবকিছুই স্বপ্নের মতো এগোচ্ছে না। প্রকল্পের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও এর বাস্তবায়নে মানবসম্পদ সংকট, মাঠ পর্যায়ের অব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণের অভাব বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, দু'হাজার বাগানের জন্য মাঠে কাজ করছেন মাত্র ৬ জন সংগঠক, যাদের নেই কৃষিতে কোনো পেশাগত ডিগ্রি। ফলে রোপণ, পরিচর্যা ও বাগান ব্যবস্থাপনায় বারবার ধাক্কা খেতে হচ্ছে।
রাঙামাটির একজন কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য,“সঠিক পরিকল্পনা ও জনবল সরবরাহ করতে পারলে পাহাড়ি অঞ্চলে কফি ও কাজুবাদাম চাষ শুধু অর্থনৈতিক মুক্তি আনবে না, বরং প্রাকৃতিক বন রক্ষার বিকল্প উপায় হিসেবেও কার্যকর হতে পারে।”
শেষ কথা কফি ও কাজুবাদাম চাষের এই আন্দোলন এক অর্থে জুম চাষের বিকল্প খোঁজার সংগ্রাম। এটিকে কৃষি খাতের একটি পরিবেশবান্ধব বিপ্লব হিসেবেও দেখা যায়। তবে, এই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, পেশাদার জনবল, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সর্বোপরি বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। পাহাড়ে কফির গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে, এখন দরকার সেই সুবাসকে টেকসই উন্নয়নের পথনির্দেশনায় পরিণত করা।
