গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে প্রথম ধাপে ৫০৯ জন শ্রমিককে অব্যাহতির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সরিয়ে নেওয়া হবে কারখানাটির প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিককে। তবে পুরো প্যাসিফিক জিন্স বন্ধ হয়ে যাচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন গুঞ্জন উড়িয়ে দিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ এম তানভীর। তাঁর ভাষ্য, কিছু ফেসবুক পোস্ট বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
কারখানাটির পুরোনো ভবন ভেঙে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ভবনটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের জীবন ও কারখানার মালামালের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করা হচ্ছে। ফলে প্রথম ধাপে ৫০৯ জন শ্রমিককে কর্মস্থল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে কারখানাটির প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিককে সরিয়ে নেওয়া হবে। নতুন ভবনে উৎপাদন শুরু হতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
কারখানার এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাঁরা ৩ নভেম্বর পর্যন্ত কাজ করবেন। এরপর থেকে কারখানাটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। শ্রমিক-কর্মচারীদের সব পাওনা পরিশোধের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ নভেম্বর। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারিয়ে সাময়িক কর্মসংস্থান সংকটে পড়ছেন বিপুলসংখ্যক শ্রমিক।
প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৪ সালে কার্যক্রম শুরু করে। সিইপিজেডে তাদের ১০টি ইউনিট রয়েছে, যেখানে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ কর্মরত। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে বন্ধ হতে যাওয়া প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেড কারখানাটি চালু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। অর্থাৎ, বন্ধ হচ্ছে প্যাসিফিক গ্রুপের পুরো কার্যক্রম নয়; নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে একটি পুরোনো কারখানার ভবন ভেঙে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন ভবনে উৎপাদন শুরু হলে পুনরায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আশা করছে কর্তৃপক্ষ।
কারখানা বন্ধের বিষয়টি নিশ্চিত করে আর এক কর্মকর্তা জানান, ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর কর্তৃপক্ষ পুনরায় পরীক্ষা করায়। এতে বুয়েট ও চুয়েটের বিশেষজ্ঞরা ভবনটি ভেঙে ফেলার পরামর্শ দেন। শ্রমিকদের জীবন ও কারখানার মালামালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ভবনটির ঝুঁকির মাত্রা, নিরীক্ষার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং নতুন ভবনের নির্মাণ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
শিল্প পুলিশ-৩ (চট্টগ্রাম)-এর পুলিশ সুপার মাহমুদা বেগম জানান, ভবনটি বয়সের কারণে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল। প্রায় এক বছর আগে জমা দেওয়া একটি প্রতিবেদনে আরসিসি ভবনটির নিরাপত্তাঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম জানান, নিরীক্ষার সময় ভবনটি ক্রেতাদের কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা পূরণেও ব্যর্থ হয়। এ কারণে পুরোনো ভবনটি ভেঙে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কারখানাটিতে আগে প্রায় পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। প্রথম ধাপে ৫০৯ জন শ্রমিককে অব্যাহতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিকের বিষয়ে ব্যবস্থাপনার সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক।
কারখানা বন্ধ হলে শ্রমিকদের অন্য কারখানায় স্থানান্তর না করে ছাঁটাই করা হচ্ছে কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে শ্রমিকদের ছাঁটাইয়ের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানাতে পারেননি। শ্রমিকদের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নতুন ভবন নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। শরিফুল ইসলাম জানান, নতুন নির্মাণকাজ শেষ করে উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে এক বছর বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে।
চাকরি হারানোর আশঙ্কার মধ্যেও শ্রমিকদের জন্য কিছু সুবিধার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। শ্রমিকদের সমুদয় পাওনা এবং অভিজ্ঞতার সনদপত্র দেওয়া হয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের পাওনা পরিশোধ করা হবে বলে জানিয়েছেন সিইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক। তিনি আরও জানান, ইপিজেডের ভেতরের অন্যান্য কারখানায় শ্রমিকদের চাকরি খুঁজে দেওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি নতুন ভবনে উৎপাদন শুরু হলে অব্যাহতি পাওয়া শ্রমিকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে নতুন ভবনে উৎপাদন শুরুর আগে শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রায় এক বছর বা তারও বেশি সময়ের নির্মাণকালীন সময়ে তাঁদের আয় ও জীবিকা কীভাবে চলবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তটি শ্রমিকদের জন্য শুধু চাকরি হারানোর ঘটনা নয়, বরং সহকর্মী ও পরিচিত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বেদনাও। শনিবার অনেক শ্রমিককে সহকর্মীদের সঙ্গে আবেগঘন বিদায় বিনিময় করতে দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কারখানার কাটিং সেকশনের কর্মীদের বিদায় জানাতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। অন্যরা কারখানায় কাটানো সময়ের স্মৃতি তুলে ধরে নিজেদের মন খারাপের কথা প্রকাশ করেন।
দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা প্রকাশ করে লিটন হাওলাদার নামে এক শ্রমিক ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আমার মন বলছে আমি থেকে যাই, কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও বাস্তবতার কাছে পরাজিত হয়ে বিদায় নিতে হচ্ছে। জীবনের বাকিটা সময় তোমাদের এই ভালোবাসা ও স্নেহ বুকে আগলে রাখব।’
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে ভবন ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত একদিকে শ্রমিকদের জীবন রক্ষার উদ্যোগ, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারানোর সাময়িক সংকট। নতুন ভবন নির্মাণ, শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ এবং পুনর্নিয়োগের আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন শ্রমিকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
