চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর করলডেঙ্গা পাহাড়ে অবস্থিত মেধস মুনির আশ্রমকে ঘিরে রয়েছে দুর্গাপূজার পৌরাণিক ইতিহাস। পুরাণের বর্ণনায় রাজ্যহারা রাজা সুরথ ও স্বজনপরিত্যক্ত বণিক সমাধি বৈশ্য মেধস মুনির আশ্রমে দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। সেই কাহিনির সূত্র ধরেই আশ্রমটিকে দুর্গাপূজার প্রাচীন সূচনাস্থল হিসেবে বিবেচনা করেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকে। অথচ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এ তীর্থভূমির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে আরও কার্যকর উদ্যোগের দাবি দীর্ঘদিনের।
বোয়ালখালী উপজেলার আহলা-করলডেঙ্গা ইউনিয়নের সন্ন্যাসীর পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এ আশ্রম। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে শিব, কালী, সীতা, তারা ও কামাখ্যা মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা। মহালয়া ও বিভিন্ন পূজা-পার্বণে এখানে সমবেত হন চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীরা। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ধর্মীয় আবহের কারণে স্থানটি তীর্থযাত্রার পাশাপাশি পর্যটনেরও সম্ভাবনাময় কেন্দ্র।
পুরাণে রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের কাহিনি
দুর্গাপূজার প্রচলন সম্পর্কে পুরাণে বর্ণিত কাহিনি অনুযায়ী, রাজ্য হারিয়ে রাজা সুরথ এবং স্বজনদের দ্বারা প্রতারিত বণিক সমাধি বৈশ্য মেধস মুনির আশ্রমে আশ্রয় নেন। তাঁদের দুঃখের কথা শুনে মেধস মুনি দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা করেন এবং দেবী দুর্গার আরাধনার পরামর্শ দেন। মুনির উপদেশ অনুসারে তাঁরা দেবীর পূজা করেন। বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ পূজা বাসন্তীপূজা নামেও পরিচিত।
স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আশ্রমের ইতিহাসবিষয়ক বর্ণনায় বলা হয়, রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্যের সেই পূজার স্থান ছিল চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মেধস মুনির আশ্রম। তবে দুর্গাপূজার উৎপত্তিস্থল হিসেবে এ স্থানের ঐতিহাসিক পরিচয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে পৌরাণিক বিশ্বাস, স্থানীয় ঐতিহ্য এবং প্রামাণ্য ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য বিবেচনা করা জরুরি।
আশ্রম পুনরাবিষ্কারের কাহিনি
আশ্রমের ইতিহাসবিষয়ক বর্ণনা অনুযায়ী, বরিশালের গৈলা অঞ্চলে জন্ম নেওয়া চন্দ্রশেখর পরবর্তী সময়ে বৈরাগ্য গ্রহণ করে বেদানন্দ স্বামী নামে পরিচিত হন। সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে সাধনার সময় তিনি মেধস মুনির আশ্রম পুনরাবিষ্কারের নির্দেশ পেয়েছিলেন বলে প্রচলিত কাহিনিতে উল্লেখ রয়েছে। পরে পাহাড়-পর্বত ঘুরে করলডেঙ্গার সন্ন্যাসীর পাহাড়ে আশ্রমটি আবিষ্কার করেন তিনি।
আশ্রমের অবস্থান, এর প্রতিষ্ঠা ও পুনরাবিষ্কার নিয়ে প্রচলিত এসব বিবরণ স্থানীয় ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে বিভিন্ন সময়ের ঐতিহাসিক নথি, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও নির্ভরযোগ্য গবেষণার মাধ্যমে এসব তথ্য আরও সুসংহতভাবে নথিবদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে।
জাতীয় আশ্রম ঘোষণার দাবি
২০০৭ সালে চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র মেধস মুনির আশ্রমকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি ও জাতীয় আশ্রম হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়ে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে। স্মারকলিপিতে আশ্রমের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব তুলে ধরে সংরক্ষণ, সংস্কার এবং উন্নয়নের দাবি জানানো হয়।
দাবিদারদের বক্তব্য, পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে আশ্রমটির অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রাচীন স্থাপনা সংরক্ষণ, ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য দলিল সংগ্রহ এবং দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে ধর্মীয় পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি চট্টগ্রামের ঐতিহ্যও দেশ-বিদেশে তুলে ধরা যাবে।
ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
মেধস মুনির আশ্রমের গুরুত্ব কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ নয়; এটি চট্টগ্রামের স্থানীয় ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। প্রতিবছর মহালয়া ও পূজা উপলক্ষে এখানে মানুষের সমাগম ঘটে। পৌষের ২৯ তারিখের মেলাও স্থানটির সঙ্গে যুক্ত একটি ঐতিহ্যবাহী আয়োজন।
এ অবস্থায় আশ্রমের স্থাপনা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সংস্কার, ইতিহাসের দলিল সংরক্ষণ এবং প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে আশ্রমের পৌরাণিক পরিচয় ও যাচাইযোগ্য ঐতিহাসিক তথ্য আলাদাভাবে উপস্থাপন করলে দর্শনার্থীরা স্থানটির ধর্মীয় তাৎপর্য ও ইতিহাস সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন।
চট্টগ্রামের এ প্রাচীন তীর্থভূমির ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, ইতিহাসবিদ, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও স্থানীয় ধর্মীয় প্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ দাবিকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়া গেলে মেধস মুনির আশ্রমের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
