আমদানি ঘোষণায় ছিল টুথপিক, কৃষিকাজের পাওয়ার স্প্রেয়ার, প্রিন্টিংয়ের হিট ট্রান্সফার পেপার কিংবা সাধারণ স্টেইনলেস স্টিল সার্কেল। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার খুলে কায়িক পরীক্ষায় মিলেছে উচ্চশুল্কের প্রসাধনী, দামি মোটরযন্ত্রাংশ, এলইডি লাইটসহ নানা পণ্য। কোথাও ঘোষিত পণ্যের সামান্য অংশ পাওয়া গেছে, কোথাও স্বল্পশুল্কের পণ্যের আড়ালে আনা হয়েছে বিপুল পরিমাণ শুল্কযোগ্য পণ্য। আবার কাস্টমসের লক ভেঙে মূল সিল বদলে জাল সিল লাগিয়ে কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টারও তথ্য মিলেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) ও চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআর শাখার যৌথ অভিযানে এ ধরনের আটটি বড় জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে।
জড়িত আমদানিকারক ও সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর ৩৩ ও ১৭১ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে এনবিআর। শনিবার (১৭ অক্টোবর) প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
স্প্রেয়ার আমদানির আড়ালে প্রসাধনী ও এলইডি লাইট
ঢাকার নিউ মার্কেট এলাকার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফরচুন গ্লোবাল ট্রেডিং চীন থেকে কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য ১১ হাজার ৯৫৬ কেজি পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন আমদানির ঘোষণা দেয়।
কিন্তু কনটেইনার খুলে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে স্টেজ লাইট, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, টুথপেস্ট, পিলিং জেল, সিরাম, বিভিন্ন ধরনের এলইডি লাইট, সানগ্লাস ও কালো চুলের শ্যাম্পু।
কায়িক পরীক্ষায় ঘোষণাবহির্ভূত পণ্যের পাশাপাশি ঘোষিত ওজনের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৮১৭ কেজি অতিরিক্ত পণ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় আড়াই কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
টুথপিকের বদলে নিষিদ্ধ ‘গোরি বিউটি ক্রিম’
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অসংগতি পাওয়া যায় পুরান ঢাকার চকবাজারের কাফ কর্পোরেশনের একটি চালানে। চীন থেকে সাড়ে ২২ টন টুথপিক আমদানির ঘোষণা দেওয়া হলেও কায়িক পরীক্ষায় টুথপিক পাওয়া যায় মাত্র ১ হাজার ৬২০ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল ক্ষতিকর রাসায়নিকযুক্ত ও বিএসটিআই নিষিদ্ধ বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা পাকিস্তানি ‘গোরি বিউটি ক্রিম’, ফেস ক্রিম, সান ক্রিম, অ্যান্টি-এজিং জেল, হেয়ার রিমুভার স্প্রে, দামি সানগ্লাস ও যৌন উত্তেজক স্প্রে।
এ চালানের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টা করা হচ্ছিল বলে এনবিআর জানিয়েছে। স্বল্পশুল্কের পণ্যের ঘোষণা দিয়ে উচ্চশুল্কের পণ্য আনার এ ঘটনায় পণ্যের প্রকৃত পরিচয়, পরিমাণ ও শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস যাচাইয়ের গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।
রাবার বুশের নামে দামি মোটরযন্ত্রাংশ
ঢাকার এইচ আর এন্টারপ্রাইজ থাইল্যান্ড থেকে ১৬ হাজার ৪০ কেজি ইঞ্জিন রাবার বুশ আমদানির ঘোষণা দেয়। কিন্তু পরীক্ষায় রাবার বুশ পাওয়া যায় মাত্র ৬ হাজার ৬২৫ কেজি। বাকি পণ্যের মধ্যে ছিল অরিজিনাল ইঞ্জিন মাউন্টিং, সাসপেনশন বুশ, আর্ম বুশ, সেন্টার বিয়ারিং, স্প্রিং শ্যাকল ও স্টিয়ারিংয়ের মতো দামি মোটরযন্ত্রাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি চালানে কমিশনারের পূর্বানুমতি ছাড়া রাতারাতি এইচএস কোড পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শুল্ক গোয়েন্দাদের নজরদারিতে সেই চেষ্টা সফল হয়নি। একই ধরনের মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে নিউ ট্রাস্ট ট্রেডার্স, মোহাম্মাদীয়া ট্রেড ও নিউ রনি এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধেও।
কাস্টমসের লক ভেঙে সিল বদলের চেষ্টা
শুধু মিথ্যা ঘোষণা নয়, কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে কনটেইনার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টার ঘটনাও সামনে এসেছে। এনবিআরের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কাফ কর্পোরেশনের আরেকটি চালান শুল্ক ফাঁকির সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ছিল। চালানটি ইয়েলো লেনভুক্ত হওয়ায় সিআইসি ও এআইআর শাখা অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সিস্টেমে সেটি লক করে দেয়।
কিন্তু নির্ধারিত কায়িক পরীক্ষার আগেই গত ১৯ সেপ্টেম্বর কনটেইনারটি অবৈধভাবে ‘কিপ ডাউন’ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর বিল অব লেডিংয়ে উল্লেখ করা মূল সিল ভেঙে সেখানে অন্য সিল লাগানো হয়। নথি পর্যালোচনায় বদলি হয়ে যাওয়া কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর জাল করে কনটেইনারটি বন্দর থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টার তথ্য পাওয়া যায়। বিষয়টি নজরে আসার পর কনটেইনারটি জব্দ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
নজরদারি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন
একই অভিযানে আটটি বড় জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে আমদানি ঘোষণার সঙ্গে প্রকৃত পণ্যের অসংগতি, শুল্ক শ্রেণিবিন্যাস পরিবর্তনের চেষ্টা এবং কাস্টমসের নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে কনটেইনার সরানোর মতো একাধিক ঝুঁকি সামনে এসেছে।
বিশেষ করে ঘোষিত পণ্যের বদলে উচ্চশুল্কের পণ্য আমদানি হলে সরকার রাজস্ব হারায়। আর নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর উপাদানযুক্ত প্রসাধনী আমদানি হলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। কাস্টমসের লক ও সিল জালিয়াতির অভিযোগ আবার বন্দর থেকে পণ্য খালাসের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
এখন এসব ঘটনায় জড়িত আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ কত দাঁড়ায় এবং জাল সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট অন্য কেউ জড়িত কি না—তা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।
এনবিআরের ঘোষিত পদক্ষেপ বাস্তবায়নের পাশাপাশি ভবিষ্যতে একই ধরনের জালিয়াতি ঠেকাতে ঝুঁকিপূর্ণ চালানের যাচাই ও কনটেইনারের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।