মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর ‘বিস্ফোরণ’ চট্টগ্রামে, ৯ মাসেই আক্রান্ত প্রায় ৫ হাজার, মৃত্যু ২১; সেপ্টেম্বরেই ২,৪৩০ রোগী ও ১৬ মৃত্যু

বছর শেষ হতে এখনো প্রায় তিন মাস বাকি। অথচ চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ছাড়িয়ে গেছে গত দুই বছরের পুরো বছরের হিসাব। সেপ্টেম্বরে এসে পরিস্থিতি নিয়েছে ভয়াবহ রূপ।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

এক মাসেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩০ জন, মারা গেছেন ১৬ জন। অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেও থামেনি সংক্রমণের গতি—নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৪৪৮ জন।

ফলে চলতি বছরের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯১৪ জনে। মৃত্যু হয়েছে ২১ জনের। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে—ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী বিস্তার কতটা নিয়ন্ত্রণে আছে? আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিধন কার্যক্রম নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগও বাড়ছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছেন ১০৭ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৬০ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৬৫৪ জন। বছরের শুরুতে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি ছিল তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে। জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯ এবং মে মাসে ৩৭ জন আক্রান্ত হন। জুনে আক্রান্ত বেড়ে হয় ১২২ জন। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে।

জুলাইয়ে আক্রান্ত হন ৫৩৬ জন। আগস্টে তা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২০২ জনে। সেপ্টেম্বরে এসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে ২ হাজার ৪৩০ জনে পৌঁছে যায়। অর্থাৎ জুনের তুলনায় সেপ্টেম্বরে আক্রান্ত বেড়েছে প্রায় ২০ গুণ। মৃত্যুর ক্ষেত্রেও সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ মাস। ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুলাইয়ে দুইজন এবং আগস্টে দুইজনের মৃত্যুর পর সেপ্টেম্বরে এক মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনে নতুন মৃত্যু না হলেও আক্রান্ত হয়েছেন ৪৪৮ জন।

ডেঙ্গুর এবারের চিত্র আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে গত দুই বছরের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৪ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছিলেন ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং মারা যান ৪৫ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন, মৃত্যু হয় ২৭ জনের। চলতি বছরের ৫ অক্টোবরেই আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৯১৪ জনে। অর্থাৎ বছরের শেষ তিন মাস শুরুর আগেই আগের দুই বছরের পূর্ণ বছরের আক্রান্তের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে ২ হাজার ২৮৫ জন, বিভিন্ন উপজেলায় ২ হাজার ৯৮ জন এবং অন্যান্য জেলা থেকে আসা রোগী ৫৩১ জন।

উপজেলাগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্ত সীতাকুণ্ডে—৬২০ জন। এরপর কর্ণফুলীতে ২৮৫, বাঁশখালীতে ১৫৪, রাঙ্গুনিয়ায় ১৫২, সাতকানিয়ায় ১২১, আনোয়ারায় ১১২, রাউজানে ১০৩ এবং পটিয়ায় ১০০ জন। হাটহাজারীতে ৮৪, চন্দনাইশে ৭৭, বোয়ালখালীতে ৭৬, মিরসরাইয়ে ৭৯, লোহাগাড়ায় ৬৬, ফটিকছড়িতে ৪৪ এবং সন্দ্বীপে ২৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন। লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে পুরুষ আক্রান্তের সংখ্যা বেশি। মোট আক্রান্তের মধ্যে পুরুষ ২ হাজার ৪০২, নারী ১ হাজার ৪০৩ এবং শিশু ১ হাজার ১০৯ জন। তবে মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেশি—২১ মৃতের মধ্যে নারী ১১, শিশু ছয় এবং পুরুষ চারজন।

ডেঙ্গুর বিস্তার বাড়লেও নগরে মশক নিধন কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে হচ্ছে না বলে অভিযোগ নগরবাসীর। হামজারবাগ সঙ্গীত আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুনতাসির উদ্দিন বলেন, এলাকায় মশার উপদ্রব বাড়লেও নিয়মিত মশক নিধনকর্মীদের দেখা যায় না। ওষুধ ছিটানোর কাজ যথাযথ হচ্ছে কি না, তা নিয়েও রয়েছে তদারকির ঘাটতি। চন্দনপুরার বাসিন্দা জামাল উদ্দিনের অভিযোগ, রোগী বাড়লেও সে অনুযায়ী তদারকি বাড়েনি।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব আশরাফুল আমিন অবশ্য বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন চলছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামও পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

গতকাল ৬ অক্টোবর রাহাত্তারপুলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে গিয়ে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বরের কর্মসূচি সফল করতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। বাসাবাড়ি, ছাদ, বারান্দা ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে না দেওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।

মেয়র বলেন, হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা দিয়ে কোনো এলাকার প্রকৃত ডেঙ্গু পরিস্থিতি নির্ধারণ করা ঠিক নয়। কোন এলাকায় রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেই তথ্যের ভিত্তিতেই প্রতিরোধ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার পাশাপাশি চসিকের বিনামূল্যের এনএস-১ পরীক্ষার সুবিধা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি জানান, মশক নিধনে জোর দিতে সিটি করপোরেশনকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর মূল বিস্তার শুরু হয়েছে জুনের পর এবং সেপ্টেম্বরে এসে তা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনের আক্রান্তের হিসাবও স্বস্তি দিচ্ছে না। ফলে চিকিৎসার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে আক্রান্ত এলাকার সুনির্দিষ্ট মানচিত্র তৈরি করে সেখানে এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস ও মশক নিধনে ধারাবাহিক অভিযান।

কারণ হাসপাতালের শয্যা বাড়িয়ে ডেঙ্গুর রোগী সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও এডিসের উৎস ধ্বংস না হলে সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি থামানো কঠিন। চট্টগ্রামের বর্তমান পরিসংখ্যান তাই শুধু রোগীর সংখ্যা নয়—সামনের দিনগুলোর জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাসপাতালকেন্দ্রিক চিকিৎসার পাশাপাশি এখন নজর দিতে হবে রোগীর ভৌগোলিক বিস্তারের দিকে। কোন ওয়ার্ড, মহল্লা কিংবা উপজেলায় সংক্রমণ বেশি—তা শনাক্ত করে সেখানে ধারাবাহিকভাবে প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও মশক নিধন চালাতে হবে। নইলে চিকিৎসা দিয়ে রোগী সামাল দেওয়া গেলেও ডেঙ্গুর উৎস নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

সম্পর্কিত বিষয়

  • ডেঙ্গুর ‘বিস্ফোরণ’

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন