মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

জনবল সংকটে রেল, স্টেশন মাস্টারের ৫৫৬ পদ শূন্য, ৬৮ শতাংশ জনবল সংকটে ২৪ হাজার একর সম্পত্তি

জনবল সংকটে ধুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো বছরের পর বছর শূন্য পড়ে থাকায় কোথাও স্টেশন বন্ধ, কোথাও টিকিট পরীক্ষা হচ্ছে না, আবার লোকোমাস্টারের ঘাটতিতে ব্যাহত হচ্ছে ট্রেনের সময়সূচি।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

এর মধ্যেই সংকট মোকাবিলা, যাত্রীসেবা উন্নয়ন ও রাজস্ব বাড়ানোর যুক্তিতে আরও ছয়টি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।

নতুন ছয়টি যুক্ত হলে পূর্বাঞ্চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত ট্রেনের সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪টিতে। এর আগে আটটি ট্রেন এ ব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে। রেলওয়ের হিসাব বলছে, সরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার পর ওই আট ট্রেনের আয় এক বছরে ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ২৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আয় বেড়েছে ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—ট্রেন পরিচালনার আয় বাড়াতে রেল কি নিজস্ব ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটানোর বদলে ধীরে ধীরে বেসরকারি নির্ভরতার দিকে যাচ্ছে? কারণ যে জনবল সংকটকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, সেই সংকট শুধু ট্রেন পরিচালনায় নয়; স্টেশন, রেলক্রসিং, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা—প্রায় পুরো কাঠামোজুড়েই।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লোকালসহ আরও ছয়টি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। জারিয়া লোকাল, নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ও নরসিংদী কমিউটারের জন্য ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অন্য ট্রেনগুলোর ক্ষেত্রেও পর্যায়ক্রমে দরপত্র আহ্বানের কথা রয়েছে।

চট্টগ্রাম-নাজিরহাট লোকালকে বগির মানোন্নয়ন শেষে কমিউটার ট্রেনে রূপান্তর করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। নোয়াখালী এক্সপ্রেস ও সমতট এক্সপ্রেস বর্তমানে বন্ধ। এগুলো চালু হওয়ার পর বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।

রেলওয়ে বলছে, সরকারি নির্ধারিত ভাড়াই কার্যকর থাকবে। অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। মূল লক্ষ্য অলাভজনক ট্রেনকে লাভজনক করা এবং যাত্রীসেবার মান বাড়ানো। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় বাণিজ্যিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগে সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত আটটি ট্রেন থেকে সর্বশেষ বছরে আয় হয়েছিল ১০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আয় দাঁড়ায় ২৬ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা—প্রায় আড়াই গুণ। এই সাফল্যের ভিত্তিতেই নতুন ট্রেনগুলো নিয়েও আয় বাড়ার প্রত্যাশা করছে রেলওয়ে।

তবে একই সঙ্গে রেলওয়ের ভেতরের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। রেল কর্মকর্তাদের মতে, লোকাল ও কমিউটার ট্রেনে স্বল্প সময়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ওঠানামা করায় পর্যাপ্ত টিকিট পরীক্ষক না থাকলে টিকিটবিহীন যাত্রী কিংবা কম দূরত্বের টিকিটে বেশি দূরত্ব ভ্রমণের ঘটনা ঘটে। এতে রাজস্ব হারায় রেল। পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মোট জনবলের প্রায় অর্ধেকই শূন্য। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি স্টেশন মাস্টার, গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে।

স্টেশন মাস্টার গ্রেড-১-এর অনুমোদিত ২৭টি পদের একটিতেও কর্মকর্তা নেই। গ্রেড-২-এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র একজন। গ্রেড-৪-এর ২৪৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ৬৬ জন, শূন্য ১৭৯টি। সহকারী স্টেশন মাস্টারের ৩৬৬টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৪৭ জন; শূন্য ২১৯টি। গেটকিপারের ৪৫০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৯৪ জন, শূন্য ২৬৫টি। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৫৮ জন; শূন্য ৪২৭টি।

লোকোমাস্টার প্রয়োজন ১২০ জন, কর্মরত ৬৫ জন, জনবল সংকটে বন্ধ স্টেশন ৫৩টি। রেল সম্পত্তি দেখভালে অনুমোদিত ১৪৪ পদ, কর্মরত ৪৬ জন বিধায় ৫৩ স্টেশনে ঝুলছে তালা। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারও বন্ধ রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগেই বন্ধ ১৯টি স্টেশন। তালিকায় রয়েছে বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মীরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড। স্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীসেবার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় এসব স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরির ঝুঁকিও বাড়ছে। ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রেও ভয়াবহ জনবল সংকট রয়েছে। পূর্বাঞ্চলে প্রয়োজন ১২০ জন লোকোমাস্টার। কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকবল দিয়ে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।

রেল কর্মীদের ভাষ্য, অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাইলেজ ও অন্যান্য সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে। ফলে জনবল ঘাটতির মধ্যেও অতিরিক্ত ডিউটি করতে অনীহা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকির জায়গা রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগ। পূর্বাঞ্চলে রেলের ২৪ হাজার ৪৪১ একর জমি দেখভালের জন্য অনুমোদিত ১৪৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৪৬ জন। শূন্য রয়েছে ৯৮টি পদ। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় জনবল সংকট প্রায় ৬৮ শতাংশ।

রেল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় নিয়মিত তদারকি ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সুযোগে মূল্যবান রেল সম্পত্তি দখলের অভিযোগও রয়েছে। অর্থাৎ একদিকে ট্রেনের টিকিট থেকে রাজস্ব আদায়ে জনবল সংকট, অন্যদিকে স্টেশন পরিচালনা ও নিরাপত্তায় ঘাটতি, আরেকদিকে হাজার হাজার একর সম্পত্তি রক্ষায় পর্যাপ্ত কর্মকর্তা নেই—সংকটটি কেবল ট্রেন পরিচালনার নয়, পুরো পূর্বাঞ্চল রেল ব্যবস্থাপনার।

আরও ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি। সংগঠনটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনিরের অভিযোগ, জনবল সংকট, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দুর্নীতির সমস্যার সমাধান না করে ট্রেন বেসরকারি হাতে দেওয়া হচ্ছে।

তার প্রশ্ন, একই ট্রেন, একই রেললাইন, একই কোচ, একই যাত্রী এবং একই সরকারি ভাড়ায় যদি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে, তাহলে রেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তা করতে পারছে না কেন? তিনি শূন্য পদ পূরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সুজিত কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, ছয়টি ট্রেনের বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। দরপত্র ও আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষ করতে প্রায় দুই মাস সময় লাগতে পারে। সরকারি নির্ধারিত ভাড়াই বহাল থাকবে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম পিইঞ্জ বলেন, কিছু স্টেশন বন্ধ থাকলেও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে সেগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলছে। রেলের হিসাবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আট ট্রেনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নতুন ছয় ট্রেন নিয়েও আয় বৃদ্ধির প্রত্যাশা করছে কর্তৃপক্ষ।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন