হামলা, ভাঙচুর, মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগের মধ্য দিয়ে প্রকাশ্য রূপ নেওয়া বিরোধে আপাতত নভেম্বরে মেলা করবে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই)। আর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিএমসিসিআই) পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ে মেলা আয়োজন করবে।
ঘটনার সূত্রপাত একই সময়ে একই মাঠে দুই চেম্বারের মেলা আয়োজনের উদ্যোগকে ঘিরে। সিএমসিসিআইয়ের দাবি, আগামী ১ থেকে ২৯ নভেম্বর ২৯ দিনব্যাপী বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রপ্তানি মেলা (বিআইটিইএফ)-২০২৬ আয়োজনের জন্য তারা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ের অনুমোদন নিয়েছে। মাঠ ভাড়া বাবদ ৪৫ লাখ টাকা পরিশোধসহ প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ জুন মেলার অনুমতি চেয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়। ১৫ জুলাই মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি-৭ শাখা ১ থেকে ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত পলোগ্রাউন্ড মাঠে মেলা আয়োজনের অনুমতি দেয়। পরে ২৬ জুলাই মাঠ ভাড়া বাবদ ৪৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার পাঠিয়ে চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ রেলওয়ে ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ড রেলওয়ে স্টেডিয়াম ও পলোগ্রাউন্ড মাঠ বরাদ্দের চুক্তিনামা সিএমসিসিআইকে পাঠায় বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
কিন্তু একই সময় পলোগ্রাউন্ডে মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নেয় সিসিসিআইও। সংগঠনটির দাবি, ৩২ বছর ধরে তারা এই মাঠে চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আয়োজন করে আসছে। সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের এই ধারাবাহিকতার কারণে অন্য কোনো সংগঠনের একই সময়ে মেলা আয়োজনের উদ্যোগ তারা মেনে নিতে পারছে না।
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই শনিবার পলোগ্রাউন্ডে মেলার প্রস্তুতিমূলক কাজ চলার সময় হামলার অভিযোগ ওঠে। সিএমসিসিআইয়ের দাবি, একদল লোক মাঠে ঢুকে নির্মাণসামগ্রী ও সরঞ্জাম ভাঙচুর করে দুটি পিকআপে তুলে নিয়ে যায়। ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি এবং তাঁকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও করা হয়।
ইভেন্ট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা মোহাম্মদ হান্নান সিকদারের দাবি, হামলাকারীরা প্রায় পাঁচ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে গেছে। পরে মেট্রোপলিটন চেম্বারের পক্ষ থেকে আরও অভিযোগ করা হয়, তাদের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান ও ফোরকানকে মারধর এবং মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ঘটনার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। একই সঙ্গে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে প্রশাসনিক পর্যায়েও তৎপরতা শুরু হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে সিসিসিআইকে নভেম্বরের পরিবর্তে ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে মেলা আয়োজনের প্রস্তাব দেয়।
রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) মামুনুল ইসলাম জানান, সিএমসিসিআই আগেই সরকারি কোষাগারে টাকা জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করেছিল। পরে সিসিসিআই একই সময়ে মাঠ ব্যবহারের আবেদন করে। তবে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বদলে দুই চেম্বারের মধ্যে সমঝোতার পথেই বিরোধের আপাত নিষ্পত্তি হয়েছে।
সিএমসিসিআইয়ের সহসভাপতি এ এম মাহবুব চৌধুরী বলেন, দুই পক্ষ কথা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—নভেম্বরে সিসিসিআই মেলা করবে এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার পরবর্তী সুবিধাজনক সময়ে মেলা আয়োজন করবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মার্চের দিকে মেট্রোপলিটন চেম্বার মেলা করার চেষ্টা করতে পারে। একই সঙ্গে এ ঘটনায় আর কোনো অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ না রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
সিসিসিআইয়ের দীর্ঘদিনের মেলা আয়োজনের ইতিহাসও বিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। সংগঠনটির দাবি, ১৯৯৮ সাল থেকে পলোগ্রাউন্ডে তারা ৩১টি আন্তর্জাতিক মেলা আয়োজন করেছে। বিভিন্ন বছর এসব মেলায় প্রায় ৪০০টি স্টলে তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে এবং মেলা থেকে তাদের আয় হয়েছে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সিএমসিসিআইয়ের এবারের আয়োজনে প্রায় ২৪০টি স্টল ও প্যাভিলিয়নে দেশি-বিদেশি শিল্পগোষ্ঠী এবং আমদানি-রপ্তানি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ার কথা ছিল। ফলে বিরোধটি শুধু মাঠ ব্যবহারের নয়, চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে মেলা আয়োজনের নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে উঠেছিল।
সমঝোতার ফলে তাৎক্ষণিক সংঘাতের অবসান হলেও পলোগ্রাউন্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ভেন্যু ব্যবহারে অনুমোদন, মাঠ বরাদ্দ, পূর্বের ঐতিহ্য ও সাংগঠনিক অধিকারের প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে। নভেম্বরের মেলা নিয়ে বিরোধ আপাতত মিটলেও পরবর্তী সময়ে মেট্রোপলিটন চেম্বারের মেলা আয়োজন ঘিরে নতুন করে কোনো জটিলতা তৈরি হয় কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।