মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

চট্টগ্রামের জ্বালানি সংকটে গার্মেন্টস শিল্পে ‘নীরব পতন’

একসময় দেশের তৈরি পোশাকশিল্পের (আরএমজি) অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল চট্টগ্রাম।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চট্টগ্রামের জ্বালানি সংকটে গার্মেন্টস শিল্পে ‘নীরব পতন’

বন্দর, রপ্তানি অবকাঠামো ও শিল্পাঞ্চল—সব সুবিধা থাকার পরও সেই চট্টগ্রামেই গার্মেন্টস কারখানার সংখ্যা ক্রমেই কমছে। প্রায় ৭০০ কারখানা থেকে সংখ্যা নেমে এসেছে প্রায় ৩০০-তে। এর মধ্যে টিকে থাকা কারখানাগুলোও এখন নতুন করে পড়েছে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অর্ডার কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ বিলম্বের চাপে। অর্থাৎ চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্পে সংকটটি একদিনের নয়। প্রথমে কমেছে কারখানা, এরপর কমেছে অর্ডার; এখন জ্বালানি সংকট এসে উৎপাদনের সক্ষমতাকেও আঘাত করছে।

চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামে ৬৯৯টি আরএমজি কারখানার মধ্যে মাত্র ৩৪৮টি কার্যক্রমে থাকার তথ্য উঠে আসে। একই সময়ে কারখানাগুলোতে দীর্ঘ লোডশেডিং ও বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত এবং ব্যয় বাড়ার কথা জানান উদ্যোক্তারা। এ সংখ্যাগুলো চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাতের ভেতরের বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—নিবন্ধিত কারখানা কত, সক্রিয় কারখানা কত এবং নিয়মিত রপ্তানি অর্ডার পাচ্ছে কতটি? ফলে শুধু নিবন্ধিত কারখানার সংখ্যা দিয়ে চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পের বর্তমান সক্ষমতা বিচার করলে প্রকৃত সংকট আড়ালেই থেকে যাবে।

চট্টগ্রামের পোশাকশিল্পে সংকটের আরেকটি চিত্র পাওয়া যায় ২০২৫ সালের তথ্যেও। গত বছরের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের ছয় মাসে কাজের অর্ডার ২৫ শতাংশ কমে যাওয়ায় চট্টগ্রামে অন্তত ৫২টি ছোট-বড় গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। তখন বিজিএমইএর হিসাবে ৬১১ নিবন্ধিত কারখানার মধ্যে প্রায় ৩৫০টি কার্যকর ছিল।

বন্ধ হয়ে যাওয়া এসব কারখানার সঙ্গে হারিয়ে গেছে শ্রমিকের কর্মসংস্থান, স্থানীয় সরবরাহকারীর বাজার এবং একটি কারখানাকে ঘিরে গড়ে ওঠা ক্ষুদ্র ব্যবসার বড় অংশ। অর্থাৎ একটি গার্মেন্টস বন্ধ হওয়ার অর্থ শুধু একটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়া নয়। তার সঙ্গে বন্ধ হয় পরিবহন, খাবার, প্যাকেজিং, অ্যাক্সেসরিজ, মেরামত, কাঁচামাল সরবরাহসহ একটি বিস্তৃত স্থানীয় অর্থনৈতিক চক্র।

২০২৬ সালের আগস্টে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করে। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। জুলাইয়ের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ ছিল প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ঘনফুট; আগস্টের শুরুতে তা কমে প্রায় ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। এতে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদন উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি তখন জানিয়েছিল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় রপ্তানিমুখী গার্মেন্টস, টেক্সটাইলসহ উৎপাদনমুখী শিল্পের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো কারখানা বন্ধ বা অলিখিত লে-অফের মুখেও পড়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

চলতি সেপ্টেম্বরের বিকেএমইএ জরিপে দেশের ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার কমিয়েছে বা বাতিল করেছে। ৭৮ শতাংশ কারখানা উৎপাদনের কোনো না কোনো অংশ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে এবং ৮৭ শতাংশ সময়মতো শিপমেন্ট করতে পারেনি। জরিপে চট্টগ্রামের কারখানার অংশ ছিল ১৮ শতাংশ।

আরও উদ্বেগজনক হলো—প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা বিদ্যুৎ সংকটের কথা জানিয়েছে এবং প্রায় ৭৫ শতাংশ গ্যাস সংকটে আক্রান্ত। উৎপাদনে এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। নিটিং উৎপাদন ৩৭ু৩৮ শতাংশ, ডাইং ৫১ শতাংশ এবং গার্মেন্টস সেলাইয়ের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।

বড় কারখানা বিকল্প জেনারেটর, নিজস্ব বিদ্যুৎ বা সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে নিতে পারলেও ছোট ও মাঝারি কারখানার সেই সক্ষমতা নেই। এ কারণেই চট্টগ্রামে বিজিএমইএ এখন ‘গার্মেন্টস ভিলেজ’ করার প্রস্তাব দিয়েছে।

সংগঠনটির মতে, ছোট ও মাঝারি কারখানাগুলো অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশ ও শ্রমিক কল্যাণের মতো কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত ও আর্থিক সীমাবদ্ধতায় রয়েছে। একটি শিল্প ক্লাস্টারে তাদের আধুনিক সুবিধা ভাগাভাগি করার সুযোগ তৈরি হলে খরচ কমানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারের কমপ্লায়েন্স ধরে রাখা সহজ হবে।

চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন কমলে প্রথম আঘাত পড়ে শ্রমঘণ্টায়। এরপর আসে ওভারটাইম কমে যাওয়া, নতুন নিয়োগ বন্ধ হওয়া এবং মজুরি পরিশোধের চাপ। ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের ৪৪টি গার্মেন্টস কারখানাকে শ্রমিকদের মজুরি ও বোনাস পরিশোধের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানায় শিল্প পুলিশ।

এসব কারখানায় প্রায় ২১ হাজার শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব কারখানার হাতে পর্যাপ্ত অর্ডার নেই এবং ব্যাংক ঋণ ও নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা বেশি, তাদের জন্য পরিস্থিতি দ্রুত কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

চট্টগ্রামের গার্মেন্টস সংকটের আরেকটি কম আলোচিত দিক হলো এর পশ্চাৎমুখী শিল্প। পোশাকের বোতাম, জিপার, লেবেল, কার্টন, পলিব্যাগ, প্যাকেজিংসহ বিপুলসংখ্যক উপকরণ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। গার্মেন্টস কারখানার অর্ডার কমলে এসব প্রতিষ্ঠানের অর্ডারও কমে যায়।

ফলে একটি রপ্তানি অর্ডার কমার প্রভাব শুধু পোশাক কারখানায় সীমাবদ্ধ থাকে না—তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো সরবরাহশৃঙ্খলে। এখানেই চট্টগ্রামের জন্য ঝুঁকিটা বেশি। কারণ ইতোমধ্যে যে শিল্পভিত্তি ছোট হয়ে এসেছে, তার ওপর আবার জ্বালানি ও অর্ডার সংকট একসঙ্গে চাপ তৈরি করছে।

চট্টগ্রামের সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন। এক. কতটি কারখানা বাস্তবে চালু আছে? নিবন্ধিত, সক্রিয় এবং নিয়মিত রপ্তানি অর্ডার পাওয়া কারখানার আলাদা হিসাব জরুরি। দুই. কতটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে? কারখানা খোলা থাকলেই উৎপাদন স্বাভাবিক—এমন নয়। জ্বালানি সংকটে অর্ধেক সক্ষমতায় চলা কারখানাও বাস্তবে সংকটাপন্ন। তিন. কত শ্রমিকের কর্মঘণ্টা ও আয় কমেছে? কারখানা বন্ধের সংখ্যা দিয়ে শ্রমবাজারের প্রকৃত ক্ষতি বোঝা যাবে না। উৎপাদন কমে গেলে কর্মঘণ্টা, ওভারটাইম ও নিয়োগের ওপর তার প্রভাব আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের সাম্প্রতিক দাবিতে তাই শুধু গ্যাসের চাপ বাড়ানোর বিষয় নেই। জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি ছোট-মাঝারি কারখানার জন্য শিল্প অবকাঠামো, কমপ্লায়েন্স সুবিধা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের সুযোগ এবং সহজ অর্থায়ন জরুরি। জাতীয় পর্যায়ে বিজিএমইএ ইতোমধ্যে গার্মেন্টস কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থার ব্যয় কমাতে কর-শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছে। চারটি প্রধান পোশাক ও টেক্সটাইল সংগঠন আবার সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি শিল্পাঞ্চলভিত্তিক গ্যাস রেশনিংয়ের প্রস্তাব দিয়েছে—যাতে সীমিত গ্যাস সরবরাহকে উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি অবদানের ভিত্তিতে ভাগ করা যায়।

চট্টগ্রামের গার্মেন্টস শিল্পের বর্তমান সংকটকে তাই কেবল ‘গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই’—এই সরল সমীকরণে দেখলে ভুল হবে। প্রায় ৭০০ থেকে ৩০০ কারখানায় নেমে আসা শিল্পভিত্তি, অর্ডার সংকোচন, সাব-কন্ট্রাক্টের ওপর নির্ভরতা, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, ছোট কারখানার দুর্বলতা এবং শ্রমিকের কর্মসংস্থানের চাপ—সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের পোশাকশিল্প এখন অস্তিত্ব রক্ষার পর্যায়ে।

আর এই সংকট দীর্ঘ হলে ক্ষতি শুধু গার্মেন্টস মালিকের নয়। ক্ষতিগ্রস্ত হবে বন্দরনির্ভর রপ্তানি বাণিজ্য, অ্যাক্সেসরিজ শিল্প, স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং হাজারো শ্রমিকের আয়। চট্টগ্রামের জন্য তাই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন—কতটি নতুন গার্মেন্টস হবে তা নয়; যে শিল্পভিত্তি ইতোমধ্যে সংকুচিত হয়েছে, সেটুকু আর কতটা ধরে রাখা যাবে।

অর্ডার কমছে, উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে লোকসান—চাপে গার্মেন্টসের সঙ্গে অ্যাক্সেসরিজ-প্যাকেজিং শিল্পও। গ্যাসের নিম্নচাপ, বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ত্রিমুখী চাপে সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে চট্টগ্রামের গার্মেন্টস খাতের পাশাপাশি পোশাকের অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পেও। অর্ডার কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় ক্রমেই বাড়ছে ব্যবসায়িক চাপ।

সম্প্রতি ১৩৪টি নিট পোশাক কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, আগস্টের শেষ দিক থেকে ৫৫ শতাংশ কারখানার ক্রয়াদেশ কমেছে অথবা বাতিল হয়েছে। একই সময়ে ৭৮ শতাংশ কারখানা উৎপাদন আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। শুধু উৎপাদন কমে যাওয়াই নয়, জ্বালানি সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তীব্র লোডশেডিং ও গ্যাসের নিম্নচাপের কারণে ৮৭ শতাংশ রপ্তানিকারক সময়মতো পণ্য জাহাজীকরণ করতে পারেননি।

প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানাকে ক্রেতাদের বড় অঙ্কের ছাড় দিতে হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে আকাশপথ ব্যবহার করছে, এতে পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে তৈরি পোশাক খাতে উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ এবং ডাইং খাতে গড়ে ৫১ শতাংশ কমেছে বলে খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য জানাচ্ছে।

পোশাক কারখানার অর্ডার কমার প্রভাব সীমাবদ্ধ থাকছে না উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে। চট্টগ্রামের পোশাকের উপকরণ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও এর ধাক্কা সামলাচ্ছে। বোতাম, জিপার, লেবেল, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন উপকরণের চাহিদা সরাসরি পোশাকের অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে গার্মেন্টসের অর্ডার কমলে সঙ্গে সঙ্গে কমে যায় অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিংয়ের অর্ডারও।

বাংলাদেশের পোশাকের উপকরণ ও মোড়ক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় পোশাকশিল্পের প্রায় ৯০ শতাংশ উপকরণের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। সরাসরি এ খাত থেকে বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি হয়। পরোক্ষ রপ্তানির মাধ্যমে এ খাতের রপ্তানি আয় ৭০০ কোটি ডলারের বেশি। ফলে গার্মেন্টসের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব দেশের বড় একটি সহায়ক রপ্তানি শিল্পেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ প্যাকেজিং অ্যান্ড অ্যাক্সেসরিজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএএমইএ) সভাপতি মো. শাহরিয়ার বলেন, পোশাকশিল্পে ক্রয়াদেশ কমে গেলে বোতাম, জিপার, লেবেল ও প্যাকেজিংসহ আনুষঙ্গিক পণ্যের চাহিদাও কমে যায়। একই সঙ্গে পোশাক কারখানাগুলো আর্থিক চাপে পড়লে সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধেও বিলম্ব হয়। এতে নগদ অর্থপ্রবাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

চট্টগ্রামভিত্তিক পোশাকের উপকরণ সরবরাহকারী আদিল ট্রিমসের স্বত্বাধিকারী এস এম আরিফুর রহমান জানান, পোশাক রপ্তানিকারকদের অর্ডার কমে যাওয়ায় নতুন করে উপকরণ ও প্যাকেজিংয়ের অর্ডারও কমেছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বিভিন্ন কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়।

সংকটের বড় ঝুঁকিতে রয়েছে ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাদের নগদ অর্থের মজুত ও ব্যাংকিং সুবিধা সীমিত। ফলে কয়েক মাস অর্ডার কম থাকা এবং একই সময়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্ডার কমে যাওয়ায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদন কার্যক্রমেও প্রভাব পড়ছে। কিন্তু শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি, কাঁচামাল কেনা ও দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় অব্যাহত থাকায় উদ্যোক্তাদের আর্থিক চাপ বাড়ছে।

এর মধ্যেই দেশে জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন ব্যয় বাড়ায় সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে পোশাকশিল্পের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের চেয়েও সরবরাহের অনিশ্চয়তাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন অনেক উদ্যোক্তা। ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেডের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় কোনোভাবে বহন করা সম্ভব হলেও নিয়মিত গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন পরিকল্পনা করা কঠিন। এইচঅ্যান্ডএমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

তার মতে, ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে একই ধরনের জ্বালানি সংকট তুলনামূলক কম। ফলে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক সোর্সিং বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পারবে কি না, তা অনেকাংশে পরিস্থিতি কত দ্রুত সামাল দেওয়া যায় তার ওপর নির্ভর করবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকট মোকাবিলায় প্রথম শর্ত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ। এতে উৎপাদন পরিকল্পনা অনুযায়ী চালানো, বিকল্প জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যয় কমানো এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তবে শুধু জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। নতুন রপ্তানি আদেশ বাড়ানো, বাজার বহুমুখীকরণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং স্থানীয় অ্যাক্সেসরিজ ও প্যাকেজিং শিল্পের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও প্রয়োজন বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পোশাকশিল্পের অর্ডার ও উৎপাদন কমলে তার সঙ্গে যুক্ত অ্যাক্সেসরিজ, প্যাকেজিং ও অন্যান্য পশ্চাৎমুখী সংযোগ শিল্পেও একই সঙ্গে মন্দা তৈরি হয়। ফলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু একটি কারখানার উৎপাদন সমস্যা নয়; এটি ধীরে ধীরে পুরো পোশাক সরবরাহশৃঙ্খলের ওপর চাপ তৈরি করছে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • আরএমজি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন