এ অবস্থায় এসডিজি বাস্তবায়নে গতি বাড়ানো, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন পরিকল্পনার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমাতে কার্যকর ও সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বক্তারা।
শনিবার চট্টগ্রামের কারিতাস কার্যালয়ে ‘রিজিওনাল পিপল্স অ্যাসেম্বলি ২০২৬’ শীর্ষক এ আঞ্চলিক জনসম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। গ্লোবাল কল টু অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট পভারটি। পিপল রাইজিং টু এন্ড ইনইক্যুয়েলিটিস’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং গ্লোবাল অ্যাকশন ইউক অন এসডিজি’স উপলক্ষে এসডিজি অ্যাকশন অ্যালায়েন্স বাংলাদেশ, এনআরডিএস (এনআরডিএস) ও আইএসডিই বাংলাদেশ যৌথভাবে এ আয়োজন করে।
ক্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আইএসডিইর নির্বাহী পরিচালক এস এম নাজের হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন ক্যাব চট্টগ্রাম বিভাগীয় সংগঠক কাজী ইকবাল বাহার ছাবেরী। মুখ্য আলোচক ছিলেন এসডিজি অ্যাকশন অ্যালায়েন্সের সমন্বয়ক ও এনআরডিএসের নির্বাহী পরিচালক আবদুল আওয়াল। আলোচনায় অংশ নেন প্রবীণ শিক্ষাবিদ ড. অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, নারীনেত্রী জেসমিন সুলতানা পারু, কলামিস্ট মুসা খান ও বিজিসি ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক সরোয়ার কামাল।
বক্তারা বলেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রগুলো ২০৩০ সালের মধ্যে ১৭টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অঙ্গীকার করে। দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণ, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, লিঙ্গসমতা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, বৈষম্য কমানো এবং টেকসই নগর ও পরিবেশ নিশ্চিত করা এ লক্ষ্যগুলোর অন্যতম। তবে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সংকটে এসব লক্ষ্যের অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হচ্ছে না।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এসডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে এখন নিয়মিত পর্যালোচনা জরুরি। কোন লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং ঘাটতি পূরণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে—তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
জাতিসংঘের ২০২৬ সালের এসডিজি অগ্রগতি প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে বক্তারা বলেন, পর্যাপ্ত প্রবণতাগত তথ্য পাওয়া ১৩৯টি লক্ষ্যের মধ্যে ৩৬ শতাংশ অন-ট্র্যাক অথবা মাঝারি অগ্রগতির পর্যায়ে রয়েছে। তবে সামগ্রিক অগ্রগতি ধীর ও অসম। অর্থায়নের ঘাটতি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঋণের চাপ, সংঘাত ও বৈষম্য এসডিজি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বক্তারা বলেন, আগামী চার বছর এসডিজি অর্জনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন করে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। এসডিজি বাস্তবায়ন শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; স্থানীয় সরকার, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তরুণদের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
তাঁরা স্থানীয় পর্যায়ে এসডিজির অগ্রগতি পর্যালোচনার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, জাতীয় পরিসংখ্যানের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সূচকভিত্তিক অগ্রগতি প্রকাশ করা দরকার। এতে উন্নয়নের সুফল কোথায় পৌঁছেছে এবং কোন জনগোষ্ঠী পিছিয়ে রয়েছে, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা মানুষসহ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তাঁরা বলেন, ‘কাউকে পিছনে না রাখা’—এসডিজির এ মূলনীতিকে বাস্তবায়নের কেন্দ্রে রাখতে হবে।
জনসম্মিলনে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের সরকারি এসডিজি ট্র্যাকারেও ১৭টি লক্ষ্যের বিভিন্ন সূচকের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তবে তথ্যের ঘাটতি থাকা ক্ষেত্রগুলোতে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। বক্তারা বলেন, এসডিজি অর্জনে এখন নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে বিদ্যমান প্রতিশ্রুতির কার্যকর বাস্তবায়ন বেশি জরুরি। পাশাপাশি উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি, অর্থায়ন বৃদ্ধি, স্থানীয় পর্যায়ে সক্ষমতা উন্নয়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ক্যাব চট্টগ্রাম মহানগরের সাধারণ সম্পাদক অজয় মিত্র শংকু, যুগ্ম সম্পাদক মো. সেলিম জাহাঙ্গীর, সমাজকর্মী মিটুল দাস গুপ্ত, প্রশিকার উপপরিচালক সাহাদত হোসেন, ক্যাব চান্দগাঁও থানা সভাপতি মো. জানে আলম, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল ফারুকী, এবিএম হুমায়ুন কবির, সায়েরা বেগম, লিটন চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, হেলাল উদ্দীন মাহবুব, মৌসুমী আক্তার, যুবায়ের ফারুক লিটন, রোজাইন আল রাফি, সাংবাদিক মনিষা চক্রবর্তী, সাহাবুদ্দিন, ওসমান জাহাঙ্গীর ও এম এ হোসাইনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
উল্লেখ্য, গ্লোবাল গোলস উইক ২০২৬ ১৯ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর পালিত হচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নে দ্রুত পদক্ষেপ, সচেতনতা ও জবাবদিহি বাড়াতে বিশ্বজুড়ে নাগরিক সমাজ, ব্যবসা, শিক্ষাঙ্গন ও জাতিসংঘ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশীজন এ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছে।