মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

পরিত্যক্ত হজ ক্যাম্পে ফিরছে প্রাণ

চার দশক ধরে জরাজীর্ণ পাহাড়তলীর ঐতিহাসিক স্থাপনা, অপরাধীদের আড্ডাস্থল; পুনরায় চালুর উদ্যোগে আশাবাদ

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

একসময় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা হজযাত্রীদের পদচারণায় মুখর থাকত চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর ঐতিহাসিক হজ ক্যাম্প। চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে সমুদ্রপথে পবিত্র হজ পালনে যাওয়া হাজারো মুসল্লির যাত্রার প্রস্তুতি ও অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এটি। অথচ দীর্ঘ চার দশকের বেশি সময় ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে সেই ক্যাম্প এখন পরিণত হয়েছে জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত স্থাপনায়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্যাম্পের ভবনগুলো ধ্বংসের মুখে, আর পুরো এলাকা হয়ে উঠেছে মাদকসেবী ও অপরাধীদের আড্ডাস্থল।

তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ঐতিহাসিক ক্যাম্পটি পুনরায় চালুর সরকারি উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও হজযাত্রীরা।

১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকার চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে প্রায় ১০ একর জমির ওপর দেশের প্রথম হজ ক্যাম্প নির্মাণ করে। সে সময় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে সমুদ্রপথে সৌদি আরবে যাওয়া হজযাত্রীরা এই ক্যাম্পে অবস্থান করতেন। হজ মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা মুসল্লিদের পদচারণায় পুরো এলাকা প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠত।

জাহাজ চলাচল বন্ধ, থেমে যায় ক্যাম্পের কার্যক্রম

১৯৮৫ সালে জাহাজযোগে হজযাত্রা বন্ধ হয়ে বিমান যোগাযোগ চালু হওয়ার পর পাহাড়তলীর ক্যাম্পটির প্রয়োজনীয়তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একপর্যায়ে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে ক্যাম্পটি। বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় ভবনগুলোতে দেখা দেয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্যাম্পের নয়টি ভবনই এখন ধ্বংসের মুখে। ২০১৪ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তর ক্যাম্পের সব ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। বর্তমানে সাড়ে নয় একর এলাকাজুড়ে থাকা ক্যাম্পটির অধিকাংশ স্থাপনা ভাঙাচোরা ও ব্যবহার অনুপযোগী।

সন্ধ্যার পর কমে যায় চলাচল

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম না থাকায় ক্যাম্পটি এখন মাদকসেবী ও অপরাধীদের নিরাপদ আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এলাকাটিতে সাধারণ মানুষের চলাচল অনেকটাই কমে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হজ ক্যাম্পটি বহু বছর ধরে বন্ধ। এটি পুনরায় চালু করা গেলে চট্টগ্রামের মানুষ অনেক উপকৃত হবে। হাজিদের যাতায়াত ও প্রস্তুতির কাজ সহজ হবে।’

হাজী জসিম আহমেদ বলেন, ‘প্রতি বছর চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ হজে যান। কিন্তু এখানে কোনো কার্যকর হজ ক্যাম্প না থাকায় নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হয়। আগে এই ক্যাম্পে মানুষের ভিড় ছিল, এখন সেটি শুধুই স্মৃতি।’

ঢাকানির্ভর হজ কার্যক্রমে ভোগান্তি

বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলের হজযাত্রীদের অধিকাংশ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের জন্য ঢাকার ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রশিক্ষণ, ব্রিফিংসহ বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে তাদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।

স্থানীয়দের মতে, পাহাড়তলীর ঐতিহাসিক হজ ক্যাম্পটি পুনরায় চালু করা গেলে চট্টগ্রাম থেকেই হজযাত্রীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ব্রিফিং ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এতে চট্টগ্রাম ও আশপাশের অঞ্চলের হাজারো হজযাত্রীর ভোগান্তি কমবে।

পুনরায় চালুর উদ্যোগ সরকারের

দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত স্থাপনাটিকে নতুন করে ব্যবহারযোগ্য করার পরিকল্পনা করছে সরকার। সম্প্রতি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন পাহাড়তলীর হজ ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ঐতিহাসিক ক্যাম্পটি পুনরায় চালুর বিষয়ে সরকারের ইতিবাচক চিন্তাভাবনার কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পরিত্যক্ত এই স্থাপনাগুলো কীভাবে কার্যকর করা যায় এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কাজে কীভাবে ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি। হজযাত্রীদের সুবিধা নিশ্চিত করাও আমাদের অগ্রাধিকার।’

তিনি জানান, হজকে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখতে সরকার ব্যয় কমানোর চেষ্টা করছে। গত বছরের তুলনায় এবার হজের খরচ প্রায় ৩০ হাজার টাকা কমানো হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কমানো সম্ভব কি না, সে বিষয়েও কাজ চলছে।

ঐতিহাসিক স্থাপনা ফিরে পাবে পুরোনো পরিচয়?

একসময় সমুদ্রপথে হজযাত্রার প্রধান প্রস্তুতিকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত পাহাড়তলীর এই ক্যাম্প এখন চট্টগ্রামের নগর ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। দীর্ঘ অবহেলায় যার ভবনগুলো ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, সেই স্থাপনাকেই নতুন করে হজযাত্রীদের সেবাকেন্দ্র হিসেবে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু ভবন সংস্কার নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ হজ সেবাকেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পটি পুনর্গঠন করা হবে। এতে একদিকে ঐতিহাসিক স্থাপনাটির অস্তিত্ব রক্ষা পাবে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের হাজারো হজযাত্রীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান ঘটবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • হজ ক্যাম্প

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন