মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

বাংলাদেশের বাণিজ্যপথ বদলে যেতে পারে, ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের লালদিয়া টার্মিনাল

চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, বড় জাহাজ ভেড়ানো, কনটেইনার খালাসের সময় ও লজিস্টিকস ব্যয় কমানো এবং বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্মাণ শুরু হয়েছে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
বাংলাদেশের বাণিজ্যপথ বদলে যেতে পারে, ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের লালদিয়া টার্মিনাল

প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে পতেঙ্গার লালদিয়া চরে নির্মিতব্য এই টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বছরে প্রায় ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা অর্জন করবে।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক চাপ কমার পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গতি ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে। গতকাল রবিবার বেলা ১১টায় আনুষ্ঠানিক গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের মধ্য দিয়ে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পতেঙ্গায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রকল্পটির নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোয় বাস্তবায়ন করছে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস। নির্মাণ শেষ করতে সময় ধরা হয়েছে তিন বছর। চুক্তি অনুযায়ী, ২০৩০ সাল থেকে ৩০ বছর টার্মিনালটি পরিচালনা করবে এপিএম টার্মিনালস। নির্ধারিত শর্ত পূরণ হলে পরিচালনার মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে মোট ৪৯ দশমিক ১৫ একর জায়গায়। এর মধ্যে ৩২ একরজুড়ে থাকবে মূল টার্মিনাল, ৭ দশমিক ১৫ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড এবং ১০ একর জায়গায় নির্মাণ করা হবে ট্রাক পার্কিং ও প্রি-গেট সুবিধা।টার্মিনালের জেটি হবে প্রায় ৬১৬ মিটার দীর্ঘ। নির্মাণ শেষে এখানে প্রায় সাড়ে ১০ মিটার ড্রাফটের এবং ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার কনটেইনারবাহী জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা তৈরি হবে। এতে বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তার কিছুটা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় ও বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি। এপিএম টার্মিনালস লালদিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রমেশ ডেভিড জানান, টার্মিনালে থাকবে ৭টি শিপ-টু-শোর গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্র্যাক্টর। এসব আধুনিক সরঞ্জামের মাধ্যমে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়ানোর পাশাপাশি টার্মিনাল পরিচালনায় দক্ষতা ও পরিবেশগত সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এসএম মনিরুজ্জামান জানান, দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য এবং ৯৮ শতাংশের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে দেশের অর্থনীতির আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিও জরুরি হয়ে পড়েছে। শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, আমদানি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থার চাপ সামলাতে নতুন টার্মিনাল যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় ছিল। এই বাস্তবতায় লালদিয়া টার্মিনালকে শুধু একটি নতুন অবকাঠামো নয়, বরং চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একটি কনটেইনার বন্দরে কত দ্রুত ওঠানামা ও খালাস করা যাচ্ছে, তার ওপর পণ্যের সামগ্রিক পরিবহন ব্যয় অনেকাংশে নির্ভর করে। জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনার ইয়ার্ডে অবস্থান, পরিবহন ও স্টোরেজ—প্রতিটি ধাপেই বাড়তি সময় মানে বাড়তি ব্যয়। লালদিয়া টার্মিনালে আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়ানো গেলে এ ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। এর প্রভাব আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা, পরিবহন খাত এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরও পড়তে পারে।বিশেষ করে বড় জাহাজ সরাসরি টার্মিনালে ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে প্রতি ইউনিট পণ্য পরিবহনের খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিপিং নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের সংযোগ আরও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

লালদিয়া টার্মিনালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত টার্মিনাল হিসেবে এর যাত্রা শুরু। ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস এতে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে।

অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়তে হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশকে বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতিতে পরিণত করতে সরকার পরিকল্পিতভাবে অর্থনৈতিক কাঠামো শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বন্দরগুলোতে টার্মিনাল পরিচালনা করছে। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং লালদিয়ায় আধুনিক বন্দর নির্মাণ একটি মাইলফলক। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিনিয়োগের পর এ বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে আরও বাড়তে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, লালদিয়া টার্মিনালের মাধ্যমে নতুন অধ্যায় রচিত হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হওয়ার পথে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তিনি বলেন, পিপিপি পদ্ধতিতে এটি একটি বড় বিনিয়োগ। টার্মিনালে অনেক আধুনিক সুবিধা থাকবে, যা দেশের জন্য সুসংবাদ। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি এবং বন্দরে বিনিয়োগে আগ্রহী আরও অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে লালদিয়া টার্মিনালের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যান্য টার্মিনালের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার সুযোগও রয়েছে। লালদিয়া চরের কাছেই পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। আরও উজানে রয়েছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল ও জেনারেল কার্গো বার্থ। ফলে কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী এ অঞ্চল ভবিষ্যতে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কনটেইনার হ্যান্ডলিং ও লজিস্টিকস করিডোরে পরিণত হতে পারে। একাধিক টার্মিনালের সক্ষমতা সমন্বিতভাবে কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম বন্দরের সামগ্রিক কর্মদক্ষতাও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

লালদিয়া টার্মিনাল প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হলেও এর পেছনে রয়েছে প্রায় পাঁচ বছরের প্রস্তুতি। ২০২১ সালের জুনে বাংলাদেশ ও ডেনমার্ক সরকারের মধ্যে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর ২০২৩ সালে এপিএম টার্মিনালস প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়। একই বছরের নভেম্বরে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত অনুমোদন দেয়।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-ডেনমার্ক পিপিপি যৌথ প্ল্যাটফর্মের বৈঠকে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যায়। অবশেষে ২০২৬ সালের ৩০ আগস্ট গ্রাউন্ড ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে দীর্ঘ প্রস্তুতি পেরিয়ে প্রকল্পটি কাগজ থেকে বাস্তব নির্মাণ পর্যায়ে প্রবেশ করল। তবে লালদিয়া টার্মিনাল ঘিরে প্রত্যাশার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, নির্ধারিত তিন বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করা। দ্বিতীয়ত, টার্মিনাল চালুর সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর সড়ক ও রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা।

কারণ, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের পরও যদি কনটেইনার দ্রুত দেশের শিল্পাঞ্চল ও ভোক্তা বাজারে পৌঁছানো না যায়, তাহলে বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত সুফল সীমিত হয়ে পড়তে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি অপারেটর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চুক্তির শর্ত, রাজস্ব আয়, সেবার মান, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়গুলোও নিয়মিত নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

লালদিয়া টার্মিনাল বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামকে শুধু বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর নয়, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিকস হাবে পরিণত করার লক্ষ্য আরও স্পষ্ট হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের তীরে বাংলাদেশের অবস্থান, আঞ্চলিক বাজারের নৈকট্য এবং দেশের ক্রমবর্ধমান আমদানি-রপ্তানি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। সেই বৃহত্তর পরিকল্পনায় লালদিয়া টার্মিনাল হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ভিত্তি। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, বছরে ৮ লাখ টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং বড় জাহাজ ভেড়ানোর সক্ষমতা—সব মিলিয়ে লালদিয়া শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প নয়; সফলভাবে বাস্তবায়ন ও পরিচালনা করা গেলে এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যিক মানচিত্রেই নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • লালদিয়া টার্মিনাল

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন