সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এর সঙ্গে বাড়ি ভাড়াসহ বিভিন্ন ভাতা ও আর্থিক সুবিধাও বাড়ছে।
সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদনের পর অর্থ মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানিয়েছে। আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে। তবে মূল বেতন তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে এবং ভাতাগুলো ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে কার্যকর হবে। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় ২০তম থেকে ১০ম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নতুন কাঠামো অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এ গ্রেডে বেতন বেড়েছে প্রায় ১৪২ শতাংশ। অন্যদিকে নবম গ্রেডের মূল বেতন ২২ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ হাজার টাকা। বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে যারা সরকারি চাকরিতে যোগ দেন, তাদের বড় একটি অংশ এ গ্রেডে বেতন পান।
সর্বোচ্চ পর্যায়ে অর্থাৎ প্রথম গ্রেডে নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা এ গ্রেডে বেতন পান। ফলে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতনের ব্যবধানের অনুপাত ১:৭৮ হয়েছে। বর্তমানে এ অনুপাত ১:৯.০৭৬।
তিন ধাপে বাস্তবায়ন
অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে এবং ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তিন ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। বেতন স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল বেতন ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে তিন ধাপে কার্যকর হবে। বিভিন্ন ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একযোগে চালু হবে।
সরকারের ভাষ্য, জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেগুলোর সুপারিশ পর্যালোচনায় সচিব কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই নতুন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
পেনশনেও বড় পরিবর্তন
নতুন বেতন কাঠামোর আওতায় পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও স্তরভেদে উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মাসিক ৯ হাজার টাকা বা এর কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ। ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ৫৫ শতাংশ বাড়বে।
এ ছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতি সন্তানের বিপরীতে মাসিক ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা এ সুবিধা পেলেও নতুন স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী মোবাইল ভাতা পাবেন।
উপকৃত হবেন ৩৩ লাখের বেশি
নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন। এতে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের বাজেটে এ অর্থের সংস্থান রাখা হয়েছে।
সশস্ত্রবাহিনীর জন্যও আলাদা বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। এটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হবে। আর জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো প্রণয়নে কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের জন্য আলাদা বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে; তবে তারাও ১ জুলাই থেকেই নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন, যা ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে।
দীর্ঘ আলোচনার পর নতুন এ বেতন কাঠামো অনুমোদনের মধ্য দিয়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বহুদিনের প্রত্যাশা পূরণ হলো। ২০১৩ সালে অষ্টম জাতীয় বেতন কমিশন গঠনের পর প্রায় ১২ বছর পর নবম বেতন কমিশন গঠিত হয়। চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি কমিশন তাদের প্রতিবেদন তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেই সুপারিশ পর্যালোচনা ও সামান্য কাটছাঁট করে নতুন বেতন কাঠামো অনুমোদন করেছে বর্তমান সরকার।
