আলোচনায় বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান, নিরাপত্তা ও জীবিকার অধিকারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি মানবাধিকার সংকট।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিকেল ৪টায় চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সুলতান আহমেদ হলে এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবাধিকার: নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়’ শীর্ষক এ গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠান পরিচালনা ও মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব মোহাম্মদ আলী। মূল প্রবন্ধে তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারী ও শিশুদের ওপর সৃষ্ট বহুমাত্রিক ঝুঁকি তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। চট্টগ্রামের মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমন্বিত নগর পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী। বিশেষ করে দুর্যোগের সময় নারী ও শিশুরা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও স্যানিটেশনসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, নিরাপদ ও বাসযোগ্য চট্টগ্রাম গড়ে তুলতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বেসরকারি সংস্থা ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে জলবায়ু ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। মানুষের জীবনমান, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করাই উন্নয়নের মূল লক্ষ্য হওয়া প্রয়োজন। নারী ও শিশুবান্ধব এবং জলবায়ু সহনশীল নগর গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান আলোচক বেগম রোকেয়া রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত শিক্ষাবিদ প্রফেসর হাসিনা যাকারিয়া বেলা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে। তাই জলবায়ু নীতিতে নারী ও শিশুর অধিকারকে অন্যতম অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মূল প্রবন্ধে মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে মানবাধিকার সংকট হিসেবে বিবেচনা করে কার্যকর, বাস্তবভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। জলবায়ুজনিত দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
দুর্যোগে বেশি ঝুঁকিতে নারী-শিশু
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বন্যা, জলাবদ্ধতা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, বাস্তুচ্যুতি ও দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
দুর্যোগের সময় নারী ও শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, স্বাস্থ্যসেবা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তাঁরা। একই সঙ্গে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রমেও নারী ও শিশুর বিশেষ চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, শুধু দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, নিরাপদ বাসস্থান, কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে নারী ও শিশুবান্ধব দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।
সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
সভায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আমাদের আলোকিত সমাজের চেয়ারম্যান মো. কামরুল ইসলাম, সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুর রহমান, পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক উর্মি সরকার, গ্রীন এলায়েন্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডসের চেয়ারম্যান সারোয়ার আমিন বাবু, রোটারিয়ান এস এম আজিজ, মাই টিভি চট্টগ্রামের প্রধান মো. নুরুল কবির, এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবিত ভাইস চেয়ারম্যান আর এস এম নিজাম উদ্দিন, যুগ্ম মহাসচিব উৎপল কুমার দাস, হাজী মো. মাইন উদ্দিন, অপরাজেয় বাংলাদেশ চট্টগ্রামের ইনচার্জ জিনাত আরা, অধ্যক্ষ এম এন হুছাইন, মোহাম্মদ শাহজাহান, চান্দগাঁও থানা শাখার সদস্যসচিব মো. আব্দুল কাদের, যুগ্ম সদস্যসচিব লাকি আক্তার, হৃদয়ের ডাক স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মো. আনিছুর রহমান, হেলাল উদ্দিন নোমান ও মঞ্জুর আহমেদ।
সভাপতির বক্তব্যে এশিয়ান নারী ও শিশু অধিকার ফাউন্ডেশনের প্রস্তাবিত ভাইস চেয়ারম্যান এডভোকেট মুহাম্মদ বরকত উল্লাহ খান জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নাগরিক সচেতনতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। নারী ও শিশুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে কার্যকর ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
গোলটেবিলে পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং নারী ও শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সম্মিলিতভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়। পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নারী ও শিশুর বিশেষ সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়।
