এ উদ্যোগকে দেশের উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর কৌশলগত কাঠামো হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
এডিবির দক্ষিণ, মধ্য ও পশ্চিম এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট ইংমিং ইয়াং বলেছেন, আইজিএনডি বাংলাদেশের নিজস্ব সরকার-নেতৃত্বাধীন ও জাতীয়ভাবে পরিচালিত উদ্যোগ। দেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে এ উদ্যোগে সহায়তা করতে পেরে এডিবি গর্বিত।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বিকেলে চট্টগ্রামের রেডিসন ব্লু হোটেলের মোহনা বলরুমে আয়োজিত আইজিএনডি বিষয়ক জাতীয় ডিসেমিনেশন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রবৃদ্ধির নতুন কাঠামো আইজিএনডি
এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস ও মানব উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময়ে দেশের উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ও টেকসই প্রবৃদ্ধি বাড়ানো এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এ জন্য দক্ষ লজিস্টিকস ব্যবস্থা, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, শক্তিশালী যোগাযোগ অবকাঠামো এবং বাজার ও অর্থনৈতিক সুযোগের মধ্যে উন্নত সমন্বয় প্রয়োজন।
আইজিএনডি দেশের প্রধান প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র, কাঁচামাল ও পণ্যের বাজারগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদারের একটি কৌশলগত কাঠামো তৈরি করবে। এর মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থাকে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও মানসম্মত কর্মসংস্থানে রূপান্তর করা সম্ভব হবে বলে মনে করে এডিবি।
চট্টগ্রামকে ঘিরে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও অন্যতম গতিশীল অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে চট্টগ্রামকে আইজিএনডির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখছে এডিবি।
ইংমিং ইয়াং বলেন, চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ভবিষ্যতে দেশের প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতেও শহরটির উন্নয়ন কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখবে।
চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ শহর ও আশপাশের অঞ্চল রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
৫ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য সহায়তা
আইজিএনডিতে এডিবির সম্ভাব্য অর্থায়নকে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য বড় ধরনের অংশীদারত্ব হিসেবে দেখছে সংস্থাটি।
ইংমিং ইয়াং জানান, গত মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা বাংলাদেশ সফরের সময় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আইজিএনডি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন। ওই সময় আগামী পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ ৫ বিলিয়ন ডলার সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
তার মতে, এ প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং আইজিএনডির রূপান্তরমূলক সক্ষমতার প্রতি এডিবির আস্থার প্রতিফলন।
চলতি বছরের শুরুতে সরকারের অনুমোদনের পর আইজিএনডিকে জাতীয় উন্নয়ন কর্মসূচির সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এতে আইজিএনডি এখন পরিকল্পনার পর্যায় থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছে এডিবি।
অবকাঠামো উন্নয়নে সমন্বিত বিনিয়োগ
শুধু সড়ক বা বন্দর নির্মাণ নয়, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন ও মানবসম্পদে সমন্বিত বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এডিবি।
ইংমিং ইয়াং বলেন, এসব খাতে বিনিয়োগ সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যায়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রগুলোতেও ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
এর ফলে শুধু চট্টগ্রাম বা রাজধানীকেন্দ্রিক প্রবৃদ্ধি নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও জাতীয় প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
যমুনা-ঢাকা নদী-ক্যানাল উন্নয়নে প্রথম পদক্ষেপ
আইজিএনডির প্রাথমিক বাস্তবায়ন পদক্ষেপ হিসেবে যমুনা-ঢাকা নদী-ক্যানাল সমন্বিত উন্নয়ন উদ্যোগ (জেডিআই) গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে জলপথ যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, জীবিকা ও আঞ্চলিক বাণিজ্য সম্প্রসারণেও এর ভূমিকা থাকবে।
অর্থাৎ আইজিএনডির পরিকল্পনায় সড়ক ও বন্দরকেন্দ্রিক যোগাযোগের পাশাপাশি নদীপথকেও অর্থনৈতিক সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থায়নের পাশাপাশি জ্ঞান ও কারিগরি সহায়তা
এডিবি শুধু অর্থায়ন নয়, জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমেও বাংলাদেশকে সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছে।
ইংমিং ইয়াং বলেন, আইজিএনডি বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপকে আরও সংযুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার একটি অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। অর্থায়ন, জ্ঞান, কারিগরি দক্ষতা ও অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ সরকারের পাশে থাকবে এডিবি।
প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কে আনার লক্ষ্য
আইজিএনডির মূল দর্শন হলো দেশের বিভিন্ন প্রবৃদ্ধি কেন্দ্র, উৎপাদন এলাকা, বাজার, বন্দর ও যোগাযোগব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কের আওতায় আনা। এতে একটি অঞ্চলের উৎপাদন অন্য অঞ্চলের বাজারে দ্রুত পৌঁছানোর পাশাপাশি শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ ও রপ্তানি প্রক্রিয়াও সহজ হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
চট্টগ্রাম বন্দর এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোর একটি। বন্দরকেন্দ্রিক লজিস্টিকস অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নত করা গেলে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সক্ষমতা আরও বাড়বে।
ফলে এডিবির সম্ভাব্য ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা শুধু কয়েকটি অবকাঠামো প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের উৎপাদন, যোগাযোগ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরিতে ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতির মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরিই হতে পারে আইজিএনডির অন্যতম বড় পরীক্ষাক্ষেত্র।
