মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

‘পরিচয়-প্রভাবে ব্যবসা নয়’—চট্টগ্রাম বন্দরে অর্থমন্ত্রীর নতুন বার্তা

‘কে কার সঙ্গে পরিচিত’ কিংবা কে কতটা প্রভাবশালী—ব্যবসা পরিচালনায় এসব কোনো বিবেচ্য বিষয় হবে না বলে কঠোর বার্তা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
‘পরিচয়-প্রভাবে ব্যবসা নয়’—চট্টগ্রাম বন্দরে অর্থমন্ত্রীর নতুন বার্তা

তার ঘোষণা, বিএনপি সরকারের অধীনে কোনো ধরনের পৃষ্ঠপোষকতামূলক, স্বজনপ্রীতিনির্ভর বা প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসার সুযোগ থাকবে না।

একই সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা কাটাতে প্রথমবারের মতো যৌথ কমিটি গঠন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে। পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, কাস্টমসের জটিলতা, বন্দরে অতিরিক্ত ব্যয়, আটকে থাকা কনটেইনার এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ—এসব সমস্যা দূর করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমকে দ্রুত ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে কাস্টমস ও বন্দরের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌথ মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম ও কাস্টমস প্রক্রিয়ার মধ্যে সমন্বয়হীনতা নিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। পণ্য খালাসে বিলম্ব, কাগজপত্রের জটিলতা, অতিরিক্ত চার্জ এবং এক প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের সঙ্গে অন্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়ে আমদানি-রপ্তানিতে বাড়তি সময় ও ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। এবার এসব সমস্যা সমাধানে দুই প্রতিষ্ঠানকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। আলোচনায় বন্দরের ও কাস্টমসের সমস্যা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার পাশাপাশি কোন সমস্যার কী সমাধান হবে, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। সিদ্ধান্তগুলো লিখিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এবং কোন সিদ্ধান্ত কত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে, তার সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, বন্দর ও কাস্টমসের যৌথ কমিটি যেকোনো সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করবে। তার প্রত্যাশা, সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত কার্যকর হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম আরও গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে সময় ও ব্যয় কমানোর উদ্যোগের সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের বাজারে। কারণ আমদানি করা কাঁচামাল, শিল্পের যন্ত্রপাতি ও ভোগ্যপণ্য বন্দরে দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে একদিকে ব্যবসায়ীদের অর্থ আটকে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে জাহাজ, কনটেইনার, গুদাম, পরিবহন ও অন্যান্য খরচ।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলে খরচ বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই খরচ সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়। বন্দরে খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়ে ভোক্তার ওপর, আবার কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতায় খরচ বাড়লেও একইভাবে জনগণকে তা বহন করতে হয়।

তাই পণ্য খালাস ও রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় কমানো এবং মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। কাস্টমস চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা কনটেইনার ও বিভিন্ন ধরনের আটকে থাকা বা অবৈধ পণ্যের জটও আলোচনায় এসেছে।

মন্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস চত্বরে কিছু অবৈধ ও আটকে থাকা পণ্য পড়ে আছে। অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও একাধিক কনটেইনার আটকে থাকার কারণে যে জট তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কাস্টমস চত্বরকে এসব জট থেকে মুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। এ ধরনের জট শুধু বন্দরের জায়গা দখল করে রাখে না; নতুন পণ্য সংরক্ষণ ও খালাসের সক্ষমতাও ব্যাহত করে। ফলে পুরোনো কনটেইনার দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগকে বন্দরের সামগ্রিক দক্ষতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ বাংলাদেশের ব্যবসা পরিবেশের দীর্ঘদিনের আলোচিত বিষয়।

এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে এবার সরাসরি অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। তিনি বলেন, কে কার সঙ্গে পরিচিত—এ ধরনের বিষয় সরকারের অধীনে চলবে না। কোনো ব্যক্তি যত বড় মন্ত্রী বা যত প্রভাবশালীই হোন, পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে না। অর্থাৎ ব্যবসার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে নিয়ম, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতাকে গুরুত্ব দেওয়ার বার্তা দিয়েছে সরকার। এ অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। কারণ বন্দরের মতো কৌশলগত বাণিজ্যকেন্দ্রে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিশ্চিত করতে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, তার কার্যকর প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ।

নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) কে পরিচালনা করবে—এটি সরকারের কাছে মূল প্রশ্ন নয় বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তার বক্তব্য, দেশি কিংবা বিদেশি—যে প্রতিষ্ঠানই বন্দর পরিচালনা করুক না কেন, তাকে জনগণ, ব্যবসায়ী, শিল্প ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে হবে। এতে এনসিটি পরিচালনা নিয়ে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় থেকে সরিয়ে সেবা, দক্ষতা ও জনস্বার্থের দিকে নেওয়ার ইঙ্গিত রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে প্রথমে স্থিতিশীলতা এবং পরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে যাওয়ার লক্ষ্যে সরকার অর্থনীতিকে চাঙা করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বৃদ্ধি, শিল্পায়ন সম্প্রসারণ এবং ব্যবসার জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ তৈরি। ব্যবসা সহজ করতে বাজেটে ডিরেগুলেশনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এখন সেই ডিরেগুলেশন বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রাম বন্দরের বন্দর-কাস্টমস সমন্বয়কে সেই বাস্তবায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দেশের আমদানি-রপ্তানির বড় অংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এখানে সময় ও ব্যয় কমানো গেলে তার প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে পড়বে।

বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে সরলীকরণ, ডিরেগুলেশন এবং কর কমানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো শিল্প খাতকে আবার সক্রিয় করে তোলা। তিনি জানান, বড় আকারে বিদেশি বিনিয়োগও আসছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা বাধাহীনভাবে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারেন। তবে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বন্দরের দক্ষতা, কাস্টমসের দ্রুততা এবং সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় কমানো না গেলে বিনিয়োগের সুফল পুরোপুরি পাওয়া কঠিন। ফলে বন্দর-কাস্টমস সংস্কার শিল্প ও বিনিয়োগনীতির সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রামকে ঘিরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন অর্থমন্ত্রী। তার ভাষ্য, এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইন থেকে সরাসরি চট্টগ্রামে এসে অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছেন। এর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামকে ঘিরে এডিবির বড় পরিকল্পনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এডিবি চট্টগ্রামকে শুধু লজিস্টিকস হাব হিসেবে দেখতে চায় না; বরং আগামী দিনে পুরো বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রপথিক হিসেবে দেখতে চায় বলে জানান তিনি। বন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস অবকাঠামো, শিল্পায়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অন্যান্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ কারণে স্থানীয় অংশীজনদের মতামত নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে এডিবি।

সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে লক্ষ্য সামনে রেখেছে, সেই যাত্রায় চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি দেশের বন্দর শুধু পণ্য ওঠানামার স্থান নয়—এটি শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, আমদানি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং ভোক্তা বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

বন্দর-কাস্টমসের সমন্বিত কার্যক্রম যদি সত্যিই পণ্য খালাসের সময় কমাতে পারে, ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা আনে, তাহলে এর সুফল কেবল বন্দর ব্যবহারকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প উৎপাদন থেকে বাজারদর, রপ্তানি প্রতিযোগিতা থেকে বিদেশি বিনিয়োগ—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই এর প্রভাব পড়তে পারে। অর্থমন্ত্রী তাই বন্দর-কাস্টমসের যৌথ উদ্যোগকে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে দেখছেন।

এখন মূল পরীক্ষা—সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কতটা বাস্তবায়িত হয়। কারণ চট্টগ্রাম বন্দরে ‘নতুন ধারা’ সৃষ্টির ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সুফল দ্রুত পণ্য খালাস, কম ব্যবসায়িক ব্যয়, স্বচ্ছ সেবা এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বাজারদরে প্রতিফলিত হবে। রপ্তানি ও শিল্পায়ন বাড়বে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এর মধ্য দিয়েই ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্যে পৌঁছানোর পথ আরও সুগম হবে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • অর্থমন্ত্রী
  • চট্টগ্রাম বন্দর
  • কাস্টমস

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন