চট্টগ্রামের ফিশারিঘাট, আনন্দবাজার, রাসমনি ঘাট, কাট্টলীসহ উপকূলীয় মাছের ঘাটগুলোতেও থাকার কথা উৎসবমুখর পরিবেশ। কিন্তু এবারের ভরা মৌসুমে সেই চেনা চিত্র অনেকটাই অনুপস্থিত।
সাগরে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ না পাওয়ার কথা জানাচ্ছেন জেলেরা। কোথাও মাছের সরবরাহ কম, আবার কোথাও মাছ থাকলেও দাম সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। ফলে ‘মাছের রাজা’ ইলিশ ক্রমেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বিলাসী খাদ্যপণ্যে পরিণত হচ্ছে।
চট্টগ্রামের উপকূলীয় এলাকায় জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীতাকুণ্ডের কুমিরা উপকূল ও সন্দ্বীপ চ্যানেলে ভরা মৌসুমেও প্রত্যাশিত ইলিশ মিলছে না। কোনো কোনো জেলে এক বেলায় মাত্র কয়েক হাজার টাকার মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরছেন।
সেই সামান্য বিক্রয়মূল্য থেকে নৌকার জ্বালানি, শ্রমিকের মজুরি, বরফ, খাবার ও অন্যান্য খরচ মেটানোর পর হাতে থাকছে খুব কম অর্থ। ইলিশের বাজারদর নির্ধারণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে সাগর ও নদীতে মাছের প্রাপ্যতা। জালে মাছ কম উঠলে শুধু জেলেই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, পুরো সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে। ঘাটে সরবরাহ কমে গেলে পাইকারি বাজারে দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তার চাপ পড়ে ভোক্তার ওপর।
জেলেদের ভাষ্য, মাছ কম পেলেও মাছ ধরার খরচ কমে না। একটি নৌকা সাগরে পাঠাতে জ্বালানি তেল, বরফ, খাবার, জাল ও শ্রমিকের পেছনে নির্দিষ্ট অর্থ ব্যয় হয়। একাধিকবার সাগরে গিয়েও যদি প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়া যায়, তাহলে প্রতি কেজি মাছের ওপর উৎপাদন খরচের চাপ আরও বেড়ে যায়।
ফলে ঘাটে তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হওয়া ইলিশ কয়েক ধাপ হাতবদলের পর খুচরা বাজারে গিয়ে আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। চট্টগ্রামের অন্যতম প্রধান সামুদ্রিক মাছ অবতরণকেন্দ্র ফিশারিঘাট। ভরা মৌসুমে একসময় এখানে বিপুল পরিমাণ ইলিশের বেচাকেনা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র অনেক সময় দেখা যাচ্ছে না।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের দিকে ভরা মৌসুমে ফিশারিঘাটে দৈনিক ইলিশের বেচাকেনা একসময় প্রায় ২ হাজার মণ পর্যন্ত উঠলেও কোনো কোনো সময়ে তা নেমে আসে প্রায় ২০০ মণে। অর্থাৎ সরবরাহে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে। এবারও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা নিয়ে জেলেদের উদ্বেগ সেই পুরোনো আশঙ্কাকেই সামনে আনছে—ভরা মৌসুমে যদি সরবরাহ স্বাভাবিক না হয়, তাহলে মৌসুম শেষে বাজার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। সীতাকুণ্ডের কুমিরা উপকূল ও সন্দ্বীপ চ্যানেল এলাকার জেলেদের কাছ থেকেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
তাদের কেউ কেউ বলছেন, এক বেলায় জালে মাত্র প্রায় ৩ হাজার টাকার ইলিশ উঠছে। এই অর্থ থেকে শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি তেলের খরচ পরিশোধ করতেই বড় অংশ চলে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে বরফ, খাবার, নৌকার রক্ষণাবেক্ষণ ও জাল মেরামতের ব্যয়।
জেলেদের মতে, মাছের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এখন মাছ ধরার প্রতিটি ট্রিপেই ঝুঁকি বাড়ছে। একদিকে খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে মাছের পরিমাণ অনিশ্চিত। ফলে জেলেদের আয় কমে যাওয়ার পাশাপাশি বাজারে ইলিশের সরবরাহও স্থিতিশীল থাকছে না। চট্টগ্রামের ইলিশের বাজার শুধু স্থানীয় জেলেদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বঙ্গোপসাগর ও স্থানীয় উপকূলীয় জলসীমায় ধরা ইলিশের পাশাপাশি বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, নোয়াখালী, হাতিয়াসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল থেকেও ইলিশ আসে চট্টগ্রামের বাজারে। আবার চট্টগ্রাম থেকেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ইলিশ পাঠানো হয়।
ফলে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ কম থাকলেও বাইরে থেকে মাছ এলে বাজারে ঘাটতি কিছুটা পূরণ হওয়ার সুযোগ থাকে। তবে বাইরে থেকে ইলিশ আসার ক্ষেত্রে পরিবহন, বরফ, শ্রমিক ও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকির খরচ যুক্ত হয়। এসব ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই পড়ে।
সাগর থেকে ধরা একটি ইলিশ সরাসরি ভোক্তার হাতে পৌঁছায় না। সাধারণত জেলে থেকে আড়তদার, পাইকার, পরিবহনকারী বা মোকাম হয়ে সেটি খুচরা বিক্রেতার কাছে যায়। প্রতিটি ধাপেই যুক্ত হয় বিভিন্ন ধরনের ব্যয় ও মুনাফা। এর সঙ্গে থাকে পরিবহন ব্যয়, বরফের খরচ, শ্রমিকের মজুরি, মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, কমিশন এবং ব্যবসায়িক মুনাফা। সরবরাহ কম থাকলে এসব ব্যয়ের প্রভাব আরও বেশি পড়ে।
ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, মাছের দাম বাড়ার পেছনে শুধু ব্যবসায়ীদের মুনাফা দায়ী নয়; উৎপাদন ও সরবরাহের প্রতিটি স্তরে ব্যয় বেড়েছে। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে একই আকারের ইলিশের দামে খুব বেশি পার্থক্য না থাকায় প্রতিযোগিতার অভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। চট্টগ্রামের ইলিশ বাজারের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—মাছ একেবারে নেই এমন নয়, কিন্তু অনেকের কেনার সামর্থ্য নেই।
২০২৫ সালের এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের খুচরা বাজারে আকারভেদে ইলিশের দাম ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা। একই বছরের জুলাইয়ে উপকূলীয় ঘাট থেকে নগরের পাইকারি ও খুচরা বাজারে ইলিশের সরবরাহ বাড়লেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে দাম সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়নি। এবারও ভরা মৌসুমে একই পরিস্থিতি দেখা দিলে প্রশ্ন উঠছে—মৌসুমের সবচেয়ে অনুকূল সময়েই যদি ইলিশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে বছরের অন্য সময়ে এর দাম কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে এক কেজি ইলিশের দাম এখন শুধু একটি মাছ কেনার হিসাব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চাল, ডাল, তেল, সবজি, মাংস, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের হিসাব। ফলে বাজারে গিয়ে ইলিশের দাম শুনে অনেক ক্রেতাকেই ফিরে যেতে হচ্ছে। কেউ ছোট আকারের ইলিশ কিনছেন, কেউ আবার চাষের রুই, কাতলা, তেলাপিয়া বা অন্যান্য তুলনামূলক সস্তা মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
ভরা মৌসুমে ইলিশের সরবরাহ কম থাকার বিষয়টি শুধু তাৎক্ষণিক বাজার সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। সাগর ও নদীতে মাছের প্রাপ্যতা, আবহাওয়ার পরিবর্তন, সমুদ্রের পরিবেশ, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়সূচি, অতিরিক্ত আহরণ, জেলেদের ব্যয় এবং বাজার ব্যবস্থাপনা—সবকিছু মিলেই ইলিশের সরবরাহ ও দাম নির্ধারিত হয়। বিশেষ করে জেলেরা যদি সাগরে গিয়ে ধারাবাহিকভাবে কম মাছ পান, তাহলে একদিকে তাদের জীবিকা সংকটে পড়বে, অন্যদিকে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দাম বাড়ার প্রবণতা তৈরি হবে।
তাই শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে বা খুচরা পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেই ইলিশের বাজার স্থিতিশীল হবে না। সাগর থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ পর্যবেক্ষণ, ঘাটভিত্তিক সরবরাহের তথ্য সংরক্ষণ এবং বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি।
ইলিশ বাংলাদেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বর্ষা এলেই ইলিশকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ বাড়ে। কিন্তু মাছের রাজা যদি ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে থাকে, তাহলে ইলিশের বাজার নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।
চট্টগ্রামের জেলেদের জালে পর্যাপ্ত ইলিশ ওঠা, ঘাটে ন্যায্য দাম পাওয়া এবং একই সঙ্গে ভোক্তার নাগালের মধ্যে বাজারদর রাখা—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে দেখতে হবে। কারণ সাগরে মাছ কমে গেলে জেলে ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর ঘাট থেকে বাজার পর্যন্ত অস্বচ্ছতা বাড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হন ভোক্তা। শেষ পর্যন্ত ইলিশের সংকট শুধু একটি মাছের সংকট থাকে না; এটি জেলে, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।