ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়লেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—যেখানে উৎপাদন চাহিদার দ্বিগুণেরও বেশি, সেখানে লোডশেডিং কেন?
চট্টগ্রাম এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এসএস পাওয়ার বাঁশখালী ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করায় বিভাগে বিদ্যুতের উৎপাদন নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিন্তু স্থানীয় ভোক্তাদের প্রত্যাশা, উৎপাদনের এই সক্ষমতার প্রতিফলন যেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহেও দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় চাহিদা ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো গেলে চট্টগ্রামে লোডশেডিং উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন প্রতিবেদনে দেখা যায়, রোববার (২ আগস্ট) সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রাম বিভাগে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩ হাজার ৩৯২ মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যা দিনের সর্বোচ্চ উৎপাদন। একই সময়ে ২ হাজার ৪ দশমিক ২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
অর্থাৎ, চট্টগ্রামের উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশই জাতীয় গ্রিডে চলে যাচ্ছে, আর স্থানীয়ভাবে ব্যবহার হচ্ছে উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম। চাহিদা ১,৩৮৮ মেগাওয়াট, ভোগ ১,৩২৯ মেগাওয়াট
পিডিবির তথ্য অনুযায়ী, রোববার দুপুরে চট্টগ্রামের নিজস্ব বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১ হাজার ৪০৯ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ১ হাজার ৩৯৫ মেগাওয়াট, ফলে ঘাটতি ছিল ১৪ মেগাওয়াট।
সন্ধ্যায় চাহিদা দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৮৭ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ নেমে আসে ১ হাজার ৩২৮ দশমিক ৭ মেগাওয়াটে। এতে সরকারি হিসাবে লোডশেডিং হয় ৫৯ দশমিক ১ মেগাওয়াট।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সময়ে এই ঘাটতি ৬৩ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করেছে। তবে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, বাস্তবে লোডশেডিংয়ের মাত্রা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি।
চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল ভরসা এখন বড় দুটি কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র। এসএস পাওয়ার বাঁশখালী উৎপাদন করেছে দুপুরে ১ হাজার ২১৪ মেগাওয়াট এবং সন্ধ্যায় ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট।
মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন করেছে যথাক্রমে ১ হাজার ১৩৩ ও ১ হাজার ১৩০ মেগাওয়াট। শিকলবাহা ২২৫ মেগাওয়াট কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে দুপুরে ২১৩ এবং সন্ধ্যায় ২০৩ মেগাওয়াট। এই তিন কেন্দ্রই মোট উৎপাদনের সিংহভাগ বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে।
উৎপাদন রেকর্ড হলেও কয়েকটি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ ছিল। ২১০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রাউজান-১ ও রাউজান-২ কেন্দ্র সারাদিন বন্ধ ছিল। অন্যদিকে কেইপিজেড সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে কোনো উৎপাদনই হয়নি।
টেকনাফ সোলার কেন্দ্র দুপুরে ১০ দশমিক ১৯ মেগাওয়াট উৎপাদন করলেও সন্ধ্যায় উৎপাদন শূন্যে নেমে আসে। একই চিত্র দেখা গেছে কাপ্তাই সোলার কেন্দ্রেও।
সরকারি হিসাবে ঘাটতি সীমিত হলেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ করছেন বাসিন্দারা। আগ্রাবাদ, হালিশহর, চান্দগাঁও, বাকলিয়া ও পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনে ও রাতে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।
হালিশহরের বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, "সবসময় শুনি চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেশি। কিন্তু আমাদের এলাকায় দিনে তিন-চারবার বিদ্যুৎ যায়। গরমে ভোগান্তি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।"
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শারমিন আক্তার বলেন, "সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে রান্না, পড়াশোনা থেকে শুরু করে সব কাজ ব্যাহত হয়। এত ঘন ঘন বিদ্যুৎ যাওয়া এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে গেছে।"
চট্টগ্রাম মহানগর দোকান মালিক সমিতির এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ছোট ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক দোকানে বিকল্প বিদ্যুতের ব্যবস্থা না থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
বিপিডিবির সহকারী পরিচালক আকবর হোসেন বলেন, চট্টগ্রামে উৎপাদন বেশি হলেও এর একটি বড় অংশ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। কোথাও কোথাও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণেও সাময়িক বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা হতে পারে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আমরা কাজ করছি।
বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে গ্রিড, সাবস্টেশন বা ফিডারের সীমাবদ্ধতার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে লোডশেডিং করতে হয়।
বিপিডিবির প্রতিবেদনে কাপ্তাই হ্রদের পানির স্তরের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। রোববার দুপুরে পানির স্তর ছিল ১০১ দশমিক ৭৩ ফুট, যা সন্ধ্যায় সামান্য কমে ১০১ দশমিক ৬৮ ফুটে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে রুল কার্ভ অনুযায়ী নির্ধারিত স্বাভাবিক স্তর ছিল ৮৯ দশমিক ৩২ ফুট। অর্থাৎ বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে পানির মজুত স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যা জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি নির্দেশ করে।
