নিলাম কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও আইনি প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে বন্দরের মূল্যবান ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে এই ‘মৃত কার্গো’|
আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে খালাস না হওয়া এসব পণ্য নিলাম বা ধ্বংস হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে বন্দরের ইয়ার্ড ও শেডে পড়ে আছে হাজার হাজার কনটেইনার| এতে একদিকে যেমন নতুন আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ে সংকট ˆতরি হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে বিদেশি শিপিং লাইনের কনটেইনারও|
বন্দর ও কাস্টমস সূত্র বলছে, বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন টার্মিনাল ও ইয়ার্ডে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনারে রয়েছে প্রায় দুই লাখ টন আমদানি পণ্য, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা| শুধু এসব কনটেইনারই বন্দরের মোট ধারণক্ষমতার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে রেখেছে| ফলে প্রতিদিন নতুন কনটেইনার সংরক্ষণ, খালাস ও পরিবহনে বাড়তি চাপ ˆতরি হচ্ছে|
বন্দর ও কাস্টমস কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই জট নিরসনে বন্দর কর্তৃপক্ষ কাস্টমসকে প্রায় ৮০ দফা চিঠি দিয়েছে| কিন্তু নিলাম ও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি| ফলে অনেক কনটেইনারে থাকা পচনশীল পণ্য সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে| একই সঙ্গে দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় কনটেইনারও ব্যবহারযোগ্যতা হারাচ্ছে, যার ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে শিপিং লাইনগুলোকে| বাজারমূল্য কমে যাওয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি, শুল্ক-সংক্রান্ত বিরোধ, আমদানিকারকের অনাগ্রহ কিংবা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ নানা কারণে এসব পণ্য খালাস নেওয়া হয়নি|
ফলে নির্ধারিত সময় পার হওয়ার পরও কনটেইনারগুলো বন্দরে আটকে আছে| চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউস প্রতি মাসে গড়ে মাত্র ২০ থেকে ৩০টি কনটেইনারের পণ্য উন্মুক্ত নিলামে বিক্রি করে| এছাড়া সীমিত আকারে কিছু পণ্য ই-অকশনের মাধ্যমেও বিক্রি হয়| সাধারণত কমলা, মাল্টা, খেজুর, আদাসহ পচনশীল পণ্য নিলামে তোলা হয়|
কাস্টমসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ হাজার ৬৯৭টি কনটেইনার নিলামের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হলেও অনুমোদন মিলেছে ১ হাজার ৬১৯টির| গত বছর ৪৯৩টি এবং চলতি বছরে ৪৯৫টি কনটেইনার নিলামের মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে| অর্থাৎ দেড় বছরে মোট ৯৮৮টি কনটেইনার নিষ্পত্তি হলেও একই সময়ে নতুন করে আরও কয়েকশ কনটেইনার নিলামের তালিকায় যুক্ত হয়েছে|
বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (মেরিন অ্যান্ড হারবার) কমোডর আমিন আহমেদ আবদুল্লাহ বলেন, "বর্তমান সক্ষমতা অনুযায়ী নিলামযোগ্য কনটেইনারগুলো বন্দরের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ জায়গা দখল করে আছে| এগুলো সরানো গেলে আমরা নতুন আমদানি-রপ্তানি পণ্য হ্যান্ডলিংয়ের জন্য বড় একটি এলাকা ফিরে পাব|"
চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মো. আল আমিন বলেন, "বিধি অনুযায়ী নিলামের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে| প্রক্রিয়াগত কারণেই সময় লাগছে| তবে নিলাম কার্যক্রম এখন গতিশীল রয়েছে|"
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহসভাপতি খায়রুল আলম সুজন বলেন, "নিলাম শেষ না হওয়ায় বছরের পর বছর কনটেইনারে থাকা পণ্য নষ্ট হচ্ছে| একই সঙ্গে কনটেইনারও ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ছে| এতে শিপিং এজেন্টদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে| দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আমরা বহুবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানিয়েছি|"
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্রবাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার| এই বন্দরের মূল্যবান ইয়ার্ডের বড় অংশ যদি বছরের পর বছর পরিত্যক্ত বা নিলামযোগ্য কনটেইনারে আটকে থাকে, তবে তা শুধু বন্দরের কার্যক্ষমতাই কমায় না, বরং আমদানি-রপ্তানি সরবরাহ শৃঙ্খল, জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ও বাড়িয়ে দেয়| সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত নিলাম, আইনি প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং আন্তঃসংস্থার সমš^য় ছাড়া এই দীর্ঘদিনের জট কাটানো সম্ভব হবে না|
