কিন্তু উদ্বোধনের প্রায় তিন বছর পরও প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি| প্রায় সাড়ে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই উড়ালসড়কের অধিকাংশ ওঠানামার র্যাম্প এখনও চালু না হওয়ায় নগরবাসী পাচ্ছে না প্রকল্পের প্রত্যাশিত সুফল|
একদিকে ইপিজেড, সলগোলা, বন্দরটিলা, আগ্রাবাদ, চৌমুহনী, দেওয়ানহাট ও বারেক বিল্ডিং মোড়ে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট| অন্যদিকে এসব এলাকার ওপর দিয়ে চলে যাওয়া উড়ালসড়ক দিনের বড় সময়ই প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে| কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি নগরের যানজট কমানোর বদলে এখন কার্যত সীমিত ব্যবহারেই আটকে আছে|
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)| ২০১৭ সালে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা| ২০২০ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ, বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আপত্তি এবং র্যাম্প নির্মাণ জটিলতায় একাধিকবার সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পায়| বর্তমানে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা, যা প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় প্রায় এক হাজার ৫০ কোটি টাকা বেশি|
২০২৩ সালের ১৪ নভে¤^র মূল অবকাঠামোর সব কাজ শেষ হওয়ার আগেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উড়ালসড়কটির উদ্বোধন করেন| তবে তখন গাড়ি চলাচল শুরু হয়নি| ২০২৪ সালের আগস্টের শেষ সপ্তাহে পরীক্ষামূলক যান চলাচল শুরু হয়| পরে ২০২৫ সালের ৩ জানুয়ারি টোল আদায়ের মাধ্যমে নতুন নামে—শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়ক—আনুষ্ঠানিকভাবে যান চলাচল শুরু হয়| কিন্তু এখনও অধিকাংশ র্যাম্প চালু না হওয়ায় নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই এক্সপ্রেসওয়েতে ওঠানামার সুযোগ নেই| বর্তমানে মূলত পতেঙ্গা, লালখান বাজার ও মুরাদপুর অংশ থেকেই যানবাহন প্রবেশ করতে পারছে|
প্রকল্পের শুরুতে ১৫টি র্যাম্প নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা কমিয়ে ৯টিতে আনা হয়| এর মধ্যে পাঁচটি র্যাম্পের নির্মাণকাজ শেষ হলেও এখনও যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়নি| নিমতলা, টাইগারপাস, ফকিরহাটসহ বিভিন্ন স্থানে র্যাম্প নির্মিত হলেও টোল বুথ নির্মাণ ও আনুষঙ্গিক কাজ শেষ না হওয়ায় সেগুলো ব্যবহার করা যাচ্ছে না| ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সরাসরি উড়ালসড়কে ওঠার সুযোগ না থাকায় অধিকাংশ চালক এখনও পুরোনো সড়কই ব্যবহার করছেন|
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লালখান বাজার-পতেঙ্গা করিডোরে প্রতিদিন প্রায় ৮১ হাজার ২৭১টি যানবাহন চলাচলের কথা| এর অন্তত অর্ধেক, অর্থাৎ ৪০ হাজারের বেশি যানবাহন এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করবে—এমন হিসাবেই প্রকল্প পরিকল্পনা করা হয়েছিল|
কিন্তু সিডিএ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রতিদিন উড়ালসড়ক ব্যবহার করছে মাত্র সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার যানবাহন| ˆদনিক টোল আদায় হচ্ছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা| ফলে যে পরিমাণ ব্যবহার ও রাজ¯ে^র প্রত্যাশা ছিল, তার কাছাকাছিও পৌঁছানো সম্ভব হয়নি|
প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকার সিডিএকে ৫২৪ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে| ২০ বছরে এই ঋণ পরিশোধ করতে হবে| পাঁচ বছরের গ্রেস পিরিয়ড শেষে ২০২৮ সাল থেকে সুদ-আসল মিলিয়ে প্রায় ৬৫৪ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে সিডিএকে| সুদের পরিমাণই প্রায় ১৩০ কোটি টাকা| বিশ্লেষকদের মতে, প্রত্যাশিত হারে যানবাহন না বাড়লে টোল থেকে পর্যাপ্ত আয় না হওয়ায় ঋণ পরিশোধেও চাপ বাড়তে পারে|
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, ভূমি অধিগ্রহণ ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার আপত্তির কারণে র্যাম্প নির্মাণে দীর্ঘদিন জটিলতা ছিল| এখন সেই সমস্যা কেটে গেছে| পাঁচটি র্যাম্পের কাজ শেষ হয়েছে| সেখানে টোল বুথ নির্মাণের পর যান চলাচল শুরু করা হবে| আগামী নভে¤^রের মধ্যে পুরো প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে|
সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে সমš^য় করে র্যাম্প নির্মাণের জটিলতা দূর করা হয়েছে| চলতি বছরের মধ্যেই সব র্যাম্পের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে|
চার হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত এই মেগা প্রকল্প কবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হবে? নগরবাসী কবে সত্যিকার অর্থে যানজটমুক্ত যাতায়াতের সুবিধা পাবে? উদ্বোধনের তিন বছর পরও এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও মেলেনি|