চার দশকের ব্যবধানে সেই শিল্প এখন দেশের ˆবদেশিক মুদ্রা আয়ের সবচেয়ে বড় খাত এবং বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক|
অথচ যে নগর থেকে এই শিল্পের সূচনা, সেই চট্টগ্রামই আজ হারাচ্ছে তার অবস্থান| যথাসময়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দ্বিতীয় উত্থানের কেন্দ্র আবারও হতে পারে চট্টগ্রাম|
একসময় দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশেরও বেশি আসত চট্টগ্রাম থেকে| বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ শতাংশে| নতুন কারখানা স্থাপনের হার অর্ধেকে নেমে এসেছে, বন্ধ হয়ে গেছে তিন শতাধিক কারখানা, আর নতুন বিনিয়োগের বড় অংশ চলে যাচ্ছে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায়| শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, নীতিগত ˆবষম্য, কেন্দ্রীয় সেবার ঢাকাকেন্দ্রিকতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবসা পরিচালনায় দীর্ঘসূত্রতাই চট্টগ্রামের এই পিছিয়ে পড়ার মূল কারণ|
চট্টগ্রামে একই সঙ্গে নতুন এক সম্ভাবনারও ইঙ্গিত মিলছে| বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর, বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, কেইপিজেড এবং ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানো গেলে চট্টগ্রাম আবারও দেশের পোশাক শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা|
সংকটের পরিসংখ্যানই বলছে বাস্তবতা অবস্থান| বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে নিবন্ধিত রপ্তানিমুখী পোশাক কারখানার সংখ্যা ৭৬৯টি| এর মধ্যে সচল রয়েছে ৪৬৮টি, আর ৩০১টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে বা অস্তিত্ব হারিয়েছে| সচল কারখানার মধ্যেও নিয়মিত রপ্তানি করে মাত্র প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান| ১৯৯১ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে প্রায় ৪০০টি নতুন পোশাক কারখানা গড়ে উঠেছিল| কিন্তু ২০০৬ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৭৪টিতে| অর্থাৎ নতুন শিল্প স্থাপনের গতি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে|
চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকামুখী বিনিয়োগের কারণ হিসেবে পোশাক শিল্প মালিকরা বলছেন, বিদেশি ক্রেতা, ব্যাংকিং সেবা, বন্ড কমিশনারেট, কাস্টমস, নীতিনির্ধারণী সংস্থা এবং সরকারি অনুমোদনের প্রায় সব কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় উদ্যোক্তাদের বারবার রাজধানীতে ছুটতে হয়| এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্প উপযোগী জমির সংকট, জমির উচ্চমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং কারখানা সম্প্রসারণের জটিলতা| ফলে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোক্তাই ঢাকাকেন্দ্রিক শিল্পাঞ্চলকে বেছে নিচ্ছেন|
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৩ দশমিক ৩১ শতাংশ কমেছে| দেশের সবচেয়ে বড় বাজার জার্মানি ছাড়াও স্পেন, ফ্রান্স ও ইতালিতে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম| একই সময়ে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও তুরস্কের মতো অপ্রচলিত বাজারেও রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ২৯ শতাংশ| যদিও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও কানাডায় কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে|
রপ্তানিকারকদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কাস্টমস ও বন্ড ব্যবস্থার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে|
সংকটের মধ্যেও চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি সমুদ্রবন্দর| দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়| বন্দরের সঙ্গে বে-টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং কর্ণফুলী টানেলের সংযোগ ˆতরি হলে সরবরাহব্যবস্থা আরও গতিশীল হবে|
এ ছাড়া মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও ফেনীজুড়ে গড়ে ওঠা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগরে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ও ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক শিল্পে বড় বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে| চট্টগ্রাম ইপিজেড, কর্ণফুলী ইপিজেড ও কোরিয়ান ইপিজেডও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে এখনো অন্যতম আকর্ষণীয় শিল্পাঞ্চল|
বিশ্ববাজারে কটনভিত্তিক পোশাকের পাশাপাশি স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, পারফরম্যান্স অ্যাপারেল এবং ম্যান-মেড ফাইবারভিত্তিক পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে| এই খাতে সময়োপযোগী বিনিয়োগ হলে চট্টগ্রাম নতুন প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারে|
বিজিএমইএর পরিচালক এস. এম আবু ˆতয়ব বলেন, বিদেশি ক্রেতা, ব্যাংকিং, বন্ড কমিশনারেট, কাস্টমস, লাইসেন্সিং, নীতিনির্ধারণী সংস্থা—সবকিছুই ঢাকাকেন্দ্রিক| ফলে চট্টগ্রামের উদ্যোক্তাদের প্রায় প্রতিটি কাজেই রাজধানীতে যেতে হয়| তার ভাষায়, "চট্টগ্রামে কারখানা পরিচালনা করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা যে সময় ও অর্থ ব্যয় করেন, ঢাকার উদ্যোক্তাদের তা করতে হয় না| এই ˆবষম্য দূর না হলে নতুন বিনিয়োগ চট্টগ্রামে আসবে না|"
বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ইউরোপের শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে| তাই উৎপাদন ব্যয় কমানো, কাস্টমস ও বন্ড ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বাজার ˆবচিত্র্য, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই| শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক শিল্পনীতি, দ্রুত গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ, কার্যকর ওয়ান-স্টপ সার্ভিস, বন্দর অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার এবং নতুন শিল্প ক্লাস্টার গড়ে তুলতে পারলে চট্টগ্রাম আবারও দেশের পোশাক শিল্পের প্রবৃদ্ধির প্রধান কেন্দ্র হতে পারে|
বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহ-সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, "একসময় দেশের মোট পোশাক রপ্তানির ৪০ শতাংশের বেশি হতো চট্টগ্রাম থেকে| এখন তা ১২ থেকে ১৪ শতাংশে নেমে এসেছে| এটি শুধু ব্যবসায়িক নয়, নীতিগত ˆবষম্যেরও ফল| ঢাকায় যেসব সিদ্ধান্ত দ্রুত হয়, চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে সেগুলো বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় লাগে| চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তা শিল্প সম্প্রসারণে কাজে লাগানো হয়নি| বন্দরকেন্দ্রিক শিল্পনীতি গ্রহণ করলে পরিবহন ব্যয় যেমন কমবে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে”|
বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে চট্টগ্রাম শুধু একটি শহর নয়, একটি সূচনা| দীর্ঘদিনের নীতিগত ˆবষম্য, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং বিনিয়োগের কেন্দ্রীয়করণের কারণে অঞ্চলটি তার নেতৃত্ব হারিয়েছে| সেই সূতিকাগার আজ সংকটে| তবে বন্দরনির্ভর অবস্থান, নতুন শিল্পনগর, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ˆবশ্বিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদাকে কাজে লাগাতে পারলে হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি| যথাসময়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দ্বিতীয় উত্থানের কেন্দ্র আবারও হতে পারে চট্টগ্রাম|