মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

বিশ্বের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে হারানো শীর্ষস্থান ফেরাতে হবে: শিল্পমন্ত্রী

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে নতুন নীতিগত কঠোরতার ঘোষণা দিয়েছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির|

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
বিশ্বের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে হারানো শীর্ষস্থান ফেরাতে হবে: শিল্পমন্ত্রী

তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে গ্রিন লাইসেন্স ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠান শিপ রিসাইক্লিং বা জাহাজ ভাঙা ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না| পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, শ্রমিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করেই এ শিল্পে ব্যবসা করতে হবে|

সোমবার সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রী এ কথা বলেন| তিনি জানান, যেসব উদ্যোক্তা গ্রিন লাইসেন্সের মানদণ্ড পূরণে আগ্রহী, সরকার তাদের প্রয়োজনীয় কারিগরি, অবকাঠামোগত ও নীতিগত সহায়তা দেবে|

শিল্পমন্ত্রী সীতাকুণ্ডের তিনটি শিপ ইয়ার্ড ঘুরে দেখেন| পরিদর্শনকালে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন চৌধুরী, শিপ রিসাইক্লিং শিল্প মালিক সমিতির প্রতিনিধিরা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন|

শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের সব শিপ রিসাইক্লিং ইউনিটকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব ও কমপ্লায়েন্ট হতে হবে| বর্তমানে দেশে ৩১টি শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড গ্রিন লাইসেন্স অর্জন করেছে| এসব ইয়ার্ড ˆবজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জাহাজ পুনর্ব্যবহার করছে| যারা এখনও গ্রিন লাইসেন্স পায়নি, তাদেরও একই মানে উন্নীত হতে হবে| কারণ ১৫০ শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডের মধ্যে বর্তমানে সক্রিয় মাত্র ৪০| গত ৬ মাসে শিল্পে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং আহত ২৫ জন|

খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, একসময় জাহাজ ভাঙা শিল্প নিয়ে পরিবেশ দূষণ, শ্রমিক শোষণ, দুর্ঘটনা এবং অ¯^াস্থ্যকর কর্মপরিবেশের অভিযোগ ছিল ব্যাপক| কিন্তু গ্রিন ইয়ার্ডগুলোতে এখন জাহাজ কাটার আগে ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য পৃথকীকরণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং পরিবেশসম্মত পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে| আজকের দিনের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন| ˆবজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ হচ্ছে, উচ্চমানের কমপ্লায়েন্স বজায় রাখা হচ্ছে| এটি বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়|

শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্পে বাংলাদেশ একসময় শীর্ষস্থানীয় দেশ ছিল| হারানো শীর্ষস্থান ফেরানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে| দুই বছর আগেও বিশ্বে ভাঙার জন্য আসা জাহাজের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বাংলাদেশে রিসাইক্লিং করা হতো| তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজ আমদানি কমে যাওয়ায় এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও নিরাপত্তা মানদণ্ডের চাপ বাড়ায় এ খাতে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা পিছিয়েছে|

বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, একসময় সীতাকুণ্ড উপকূলে প্রায় ১৫০টি শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ছিল| বর্তমানে সক্রিয় ইয়ার্ডের সংখ্যা প্রায় ৪০টি| ২০২১ সালে ভাঙার জন্য দেশে ২৮০টি জাহাজ আমদানি হলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯৩টিতে|

মন্ত্রী বলেন, সাময়িক এই পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে বাংলাদেশ আবারও বিশ্বে জাহাজ রিসাইক্লিংয়ে এক ন¤^র অবস্থান ফিরে পাবে| তবে সেই নেতৃত্ব হবে পরিবেশবান্ধব, শ্রমিকবান্ধব এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্প কাঠামোর ভিত্তিতে| গ্রিন লাইসেন্স মূলত এমন একটি ¯^ীকৃতি, যার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সংশ্লিষ্ট ইয়ার্ড জাহাজ রিসাইক্লিংয়ের সময় পরিবেশ সুরক্ষা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শ্রমিকের ¯^াস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স মানদণ্ড অনুসরণ করছে| জাহাজে থাকা তেল, অ্যাসবেস্টস, ভারী ধাতু, রাসায়নিক বর্জ্য, প্লাস্টিক, ˆবদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে উপকূলীয় পরিবেশ, মাটি, পানি ও শ্রমিক¯^াস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি ˆতরি হয়| ফলে গ্রিন ইয়ার্ডে নিরাপদ কাটিং জোন, বর্জ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, অগ্নিনিরাপত্তা এবং জরুরি চিকিৎসাসহায়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি|

বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ রিসাইক্লিং ব্যবসা ধরে রাখতে গ্রিন লাইসেন্স এখন শুধু পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়; এটি বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতারও শর্ত| ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জাহাজ মালিকরা ক্রমেই আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত ও পরিবেশসম্মত ইয়ার্ডে জাহাজ পাঠাতে আগ্রহী হচ্ছেন|

শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে চাঁদাবাজি, প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্যোক্তাদের উদ্বেগের কথাও উঠে আসে মন্ত্রীর বক্তব্যে| তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা কোনো ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হলে সরকার তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে| প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি| তাঁর ভাষ্য, শিল্পের ¯^াভাবিক কার্যক্রমে অযৌক্তিক বাধা থাকলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে|

সীতাকুণ্ডের শিল্পাঞ্চলসহ দেশের শিল্প খাতের বড় চ্যালেঞ্জ এখন জ্বালানি সংকট| শিল্পমন্ত্রী বলেন, দেশে ˆদনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে| ফলে তাৎক্ষণিকভাবে গ্যাস সংকট দূর করা সম্ভব নয়| বিদ্যমান ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় ¯^ল্প সময়ে গ্যাস সরবরাহ নাটকীয়ভাবে বাড়ানো কঠিন| তবে শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ¯^াভাবিক করতে সরকার জরুরি কর্মসূচি বা ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নিয়েছে| একই সঙ্গে কীভাবে দ্রুত গ্যাসের যোগান বাড়ানো যায়, তা নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে| অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পাঞ্চল এবং উৎপাদনমুখী খাতের নীতিগত সমস্যাগুলো সমাধানেও সরকার কাজ করছে|

বাংলাদেশের জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প দেশের ইস্পাত, রড, প্লেট, যন্ত্রাংশ, আসবাব, ˆবদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং বিভিন্ন পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের বড় উৎস| এ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক, পরিবহন ব্যবসা, স্ক্র্যাপ বাণিজ্য এবং রি-রোলিং মিল যুক্ত| তবে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা এবং শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এ শিল্পের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখা কঠিন হবে| তাই গ্রিন লাইসেন্সকে বাধ্যতামূলক করার সরকারি ঘোষণা সীতাকুণ্ডের শিপ রিসাইক্লিং শিল্পে নতুন যুগের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে|

তবে শিল্পটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে| চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস)|

বিলসের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে ১০ জন গুরুতর এবং ১৫ জন মাঝারি আহত হয়েছেন| দুর্ঘটনার প্রায় ৮০ শতাংশ ঘটেছে গার্ডার বা ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, ক্রেন-হুক-ওয়্যারজনিত ঘটনা এবং গ্যাস ও অগ্নিকাণ্ডের কারণে| এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি আটটি দুর্ঘটনা ঘটে| দিনের বেলায় ২১টি এবং রাতে সাতটি দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে|

শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের মতে, কাটারম্যান, কাটার হেলপার, ক্রেন হেলপার, ওয়্যার গ্রুপ, ফিটারম্যান ও লোডিং গ্রুপের শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কাজ করেন| অনিরাপদ আচরণ, সুরক্ষা সরঞ্জামের ঘাটতি, দুর্বল তদারকি এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাবকে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে|

সম্পর্কিত বিষয়

  • জাহাজ রিসাইক্লিং শিল্প

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন