সব মিলিয়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৫৭ জনে| চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ হাজার ১৯৮ জন, তবে প্রাণ হারিয়েছেন তিনজন|
¯^াস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২৮ জন ডেঙ্গু রোগী সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন| বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৯ জন রোগী| এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ২২ জন, কক্সবাজারে ১০ জন, বান্দরবানে ১১ জন এবং খাগড়াছড়িতে নতুন চারজনসহ একাধিক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন| ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় মিলিয়ে আরও ছয়জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন|
চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (¯^াস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, আগাম বর্ষার প্রভাবে জুন মাস থেকেই ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে| বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নভে¤^র পর্যন্ত সংক্রমণের এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে| পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালের শতাধিক চিকিৎসক ও সিনিয়র স্টাফ নার্সকে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে|
নগরের বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদেরও প্রশিক্ষণের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত স্যালাইন, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে|
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণকাজ, জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিত্যক্ত প্লাস্টিক ও টায়ারে জমে থাকা পানি চট্টগ্রাম নগরকে এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশে পরিণত করছে| বর্ষাকালে নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ, ছাদে রাখা পানির ট্যাংক, ফুলের টব, এসির ট্রে, পরিত্যক্ত বোতল, ডাবের খোসা ও খোলা পাত্রে জমে থাকা পরিষ্কার পানি এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হয়| ফলে শুধু মশক নিধন কার্যক্রম নয়, উৎসস্থল ধ্বংসে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ জরুরি হয়ে উঠেছে|
জন¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর বিস্তার মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে—এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু ভাইরাসের উপস্থিতি এবং আক্রান্ত মানুষের চলাচল| এই তিনটির যেকোনো একটিকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে সংক্রমণের হারও কমানো সম্ভব| তাঁদের মতে, ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া ছিটিয়ে শুধু পূর্ণবয়স্ক মশা কিছুটা কমানো যায়; কিন্তু ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো লার্ভা ধ্বংস এবং মশার প্রজননস্থল নির্মূল করা|
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে| চসিকের উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে, জলাবদ্ধ স্থান পরিষ্কার, খাল-নালা ও ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম এবং পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা| এ ছাড়া বাসাবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও নির্মাণাধীন ভবনে সচেতনতামূলক অভিযান, ওয়ার্ডভিত্তিক মাইকিং, প্রচারপত্র বিতরণ, হটলাইন ও অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষ মশক নিধন অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে| ¯^াস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন ¯ে^চ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে সমšি^ত কার্যক্রমও চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে চসিক|
চসিকের কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়| প্রতিটি পরিবারকে সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজেদের বাসার ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করতে হবে| একটি বাড়ির অবহেলাও পুরো মহল্লার জন্য ঝুঁকি ˆতরি করতে পারে|
একসময় ডেঙ্গু মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক রোগ হিসেবে পরিচিত ছিল| কিন্তু এখন পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতেও আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে| ¯^াস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, মানুষের চলাচল বৃদ্ধি, জলবায়ুর পরিবর্তন এবং বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যাওয়ায় এসব এলাকাতেও এডিস মশার বিস্তার ঘটছে|
পার্বত্য এলাকায় ¯^াস্থ্যসেবার অবকাঠামো তুলনামূলক সীমিত হওয়ায় সেখানে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং রোগী ব্যবস্থাপনায় বাড়তি নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা|
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালসহ বিভাগীয় সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে| রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা, স্যালাইন সরবরাহ, প্লাটিলেট পর্যবেক্ষণ এবং জটিল রোগী ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে|
চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গু জ্বর হলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি| বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর পেটব্যথা, বমি, অ¯^াভাবিক দুর্বলতা, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট বা প্রস্রাব কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে|
¯^াস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সপ্তাহে অন্তত একদিন বাসা, ছাদ ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দিয়েছেন| কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না| ফুলের টব, এসির ট্রে, ড্রাম, পানির পাত্র ও পরিত্যক্ত জিনিসপত্র নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে| দিনের বেলাতেও মশারি ব্যবহার, ফুলহাতা পোশাক পরা এবং শিশুদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে|
জ্বর হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে| চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ গ্রহণ থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে|
¯^াস্থ্য বিভাগের আশঙ্কা, জুলাই থেকে সেপ্টে¤^র পর্যন্ত ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে| ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন, ¯^াস্থ্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন এবং নাগরিকদের সমšি^ত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি|
