মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

চট্টগ্রাম বন্দরের সেবায় নতুন দিগন্ত ওয়ান স্টপ সার্ভিস

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালিত হওয়ার কারণে প্রতিদিন হাজারো ব্যবসায়ী, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, শিপিং এজেন্ট, ট্রাকচালক ও বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার পদচারণায় মুখর থাকে বন্দর এলাকা|

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চট্টগ্রাম বন্দরের সেবায় নতুন দিগন্ত ওয়ান স্টপ সার্ভিস

এই বিপুল সেবাপ্রার্থীর চাপ সামাল দিতে এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চালু করেছে আধুনিক ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) ভবন|

বুধবার চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান বেলুন উড়িয়ে ও ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে এসব কথা বলেন| অনুষ্ঠানে বন্দরের সদস্য, পরিচালক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন|

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়; বরং স্মার্ট পোর্ট ব্যবস্থাপনার পথে বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো| দীর্ঘদিন ধরে বন্দরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টারটি মূল বন্দরের অভ্যন্তরে পরিচালিত হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপত্তা বেষ্টনী অতিক্রম করে বন্দরের ভেতরে প্রবেশ করতে হতো|

এতে একদিকে যেমন নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতো, অন্যদিকে অপারেশনাল কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটত| নতুন ভবনটি বন্দরের মূল অপারেশন এলাকা থেকে পৃথক স্থানে নির্মাণ করায় এখন সেবাগ্রহীতাদের আর বন্দরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হবে না| ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে, যানজট ও প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস পাবে এবং বন্দরের মূল কার্যক্রম আরও নির্বিঘ্ন হবে|

বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, অতীতে ওয়ান স্টপ সার্ভিস বন্দরের ভেতরে থাকায় হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল| নতুন ভবন আন্তর্জাতিক বন্দর নিরাপত্তা বিধিমালা (আইএসপিএস কোড) অনুসারে নির্মিত হয়েছে| তাঁর ভাষায়, এটি বন্দরের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ| নতুন এই ভবন শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ ও দ্রুতগতির বন্দর ব্যবস্থার প্রতীক|

২০২২ সালে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ শেষে চালু হওয়া আধুনিক ভবনটিতে সেবাগ্রহীতাদের জন্য ধাপে ধাপে সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে| নিচতলায় রয়েছে আধুনিক রিসেপশন ও তথ্যকেন্দ্র| প্রথম তলায় টোকেন সংগ্রহ ও প্রাথমিক সেবা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে| পরবর্তী তিনটি তলায় বিভিন্ন বন্দরসেবা প্রদান করা হবে| ভবনের প্রতিটি তলায় ব্যাংকিং বুথ স্থাপন করা হয়েছে, যাতে ফি পরিশোধসহ আর্থিক লেনদেন একই স্থানে সম্পন্ন করা যায়| ভবনের পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলা ইতোমধ্যে ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যা থেকে নিয়মিত রাজ¯^ আয় হবে| বাকি তলাগুলো বন্দরের প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যবহৃত হবে|

চেয়ারম্যানের মতে, এই ভবন থেকে মাসে প্রায় ৫ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আয় হবে| এই আয় অব্যাহত থাকলে এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই নির্মাণ ব্যয়ের বড় অংশ উঠে আসবে| ফলে এটি শুধু সেবা প্রদানকারী অবকাঠামো নয়, বরং রাজ¯^ আয়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হবে| ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন এমন এক সময়ে হলো, যখন ২০২৫-২৬ অর্থবছরকে চট্টগ্রাম বন্দরের ইতিহাসে অন্যতম সফল বছর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে|

২০২৫-২৬ এই অর্থবছরে বন্দরের মোট রাজ¯^ আয় দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৬২৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা, আর কর-পরবর্তী রাজ¯^ উদ্বৃত্ত হয়েছে ৩ হাজার ৩৯৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ| একই সময়ে শতভাগ ই-গেট পাস ব্যবস্থা চালু হয়েছে| এখন বিকাশ, নগদ, রকেট ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আগেই ফি পরিশোধ করে কিউআর কোডভিত্তিক গেট পাস সংগ্রহ করা যাচ্ছে| প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার যানবাহন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বন্দরে প্রবেশ ও প্রস্থান করছে|

এছাড়া জাতীয় রাজ¯^ বোর্ডের এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড এর সঙ্গে বন্দরের টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) সংযুক্ত হওয়ায় বিল অব এন্ট্রি, কনটেইনার ও জাহাজসংক্রান্ত তথ্য ¯^য়ংক্রিয়ভাবে আদান-প্রদান করা যাচ্ছে| একই সঙ্গে সিপিএ স্কাই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে কাস্টমস, ব্যাংক, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডারসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা হয়েছে| নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের অন্যতম ˆবশিষ্ট্য হলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান বজায় রেখে এর নকশা ও পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা|

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড পরিচালিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নে চট্টগ্রাম বন্দর 'জিরো অবজারভেশন' অর্জন করেছে| অর্থাৎ বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি চিহ্নিত হয়নি| পাশাপাশি অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ, রিয়েল-টাইম সাইবার থ্রেট শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের ডাটা সুরক্ষা নিশ্চিত করা হচ্ছে|

গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর আবারও জিরো ওয়েটিং টাইম অর্জন করেছে| ফলে বহির্নোঙরে জাহাজের দীর্ঘ অপেক্ষা প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে| কনটেইনারবাহী জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২.৫৮ দিন থেকে কমে ২.৩৮ দিনে নেমে এসেছে, যা পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির স্পষ্ট প্রমাণ|

বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০৪০ সালের মধ্যে বছরে ৩০ কোটি ৭০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৮.৭ মিলিয়ন টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে| এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বে-টার্মিনাল, ডিপ সি কনটেইনার টার্মিনাল, মাল্টিপারপাস টার্মিনাল এবং হেভি লিফট কার্গো জেটিসহ একাধিক বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে|

বন্দরসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখন শুধু জেটি বা ক্রেন বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন দ্রুত সেবা, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করা| নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবন এই তিনটি লক্ষ্য পূরণের দিকেই বড় পদক্ষেপ| তাদের মতে, এক ছাদের নিচে সব ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক সেবা, ডিজিটাল পদ্ধতিতে আবেদন নিষ্পত্তি এবং বন্দরের মূল অপারেশন এলাকা থেকে জনসমাগম কমিয়ে আনার ফলে সময়, ব্যয় ও নিরাপত্তা—তিন ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে|

চট্টগ্রাম বন্দর এখন শুধু দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর নয়; দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রতিযোগিতামূলক স্মার্ট পোর্টে পরিণত হওয়ার পথে এগোচ্ছে| রেকর্ড রাজ¯^, জিরো ওয়েটিং টাইম, ডিজিটাল সেবা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ¯^ীকৃতি এবং নতুন ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের উদ্বোধন—সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছর বন্দরের আধুনিকায়নের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে|

সম্পর্কিত বিষয়

  • চট্টগ্রাম বন্দর
  • ওয়ান স্টপ সার্ভিস

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন