বাংলাদেশের ˆবদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব বহন করে চট্টগ্রাম বন্দর|
প্রতিদিন হাজার হাজার কনটেইনার, শত শত জাহাজ, কোটি কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন এবং অসংখ্য ডিজিটাল তথ্যের প্রবাহ চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল| ফলে বন্দরের নিরাপত্তা এখন আর কেবল জেটি, কনটেইনার ইয়ার্ড কিংবা নৌপথে সীমাবদ্ধ নেই; সমান গুরুত্ব পেয়েছে সাইবার অবকাঠামো এবং শিল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থাও|
বিশ্বব্যাপী বন্দরগুলোতে সাইবার হামলার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি বিপজ্জনক শিল্প দুর্ঘটনা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে| একদিকে চালু হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতায় শুরু হয়েছে আঞ্চলিক শিল্প নিরাপত্তাবিষয়ক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি| সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই দুই উদ্যোগ চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে|
ডিজিটাল বন্দরের নতুন নিরাপত্তা বলয় গঠনে গত রবিবার বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান অত্যাধুনিক সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম উদ্বোধন করেন| বন্দরের প্রায় সব কার্যক্রম বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হওয়ায় সাইবার নিরাপত্তা এখন বন্দরের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার| সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে র্যানসমওয়্যার, ম্যালওয়্যার, ডিস্ট্রিবিউটেড ডিনায়াল অব সার্ভিস (ডিডিওএস) হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে|
নতুন সিস্টেমের মাধ্যমে— সম্ভাব্য সাইবার হামলা আগাম শনাক্ত করা যাবে| বন্দরের সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত থাকবে| ২৪ ঘণ্টা সিকিউরিটি অপারেশনস সেন্টার থেকে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলবে| সন্দেহজনক নেটওয়ার্ক কার্যক্রম তাৎক্ষণিক শনাক্ত করা সম্ভব হবে| ভবিষ্যৎ তদন্তের জন্য প্রতিটি ঘটনার ডিজিটাল ফরেনসিক তথ্য সংরক্ষণ করা হবে|
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক বন্দর পরিচালনায় অপারেশনাল টেকনোলজি (ওটি) ও ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইটি) এখন একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত| ফলে একটি সফল সাইবার হামলা কনটেইনার মুভমেন্ট, কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজের সময়সূচি, কাস্টমস কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল পর্যন্ত বিপর্যস্ত করে দিতে পারে|
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের বড় বড় সমুদ্রবন্দর সাইবার হামলার শিকার হয়েছে| এসব হামলায় কয়েকদিন পর্যন্ত বন্দর কার্যক্রম বন্ধ থাকার নজির রয়েছে| এতে বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ˆবশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে|
চট্টগ্রাম বন্দরেও বর্তমানে ই-ডেলিভারি অর্ডার, অনলাইন বিলিং, কনটেইনার ট্র্যাকিং, ভেসেল ম্যানেজমেন্ট, কার্গো অপারেশনসহ অধিকাংশ সেবা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হচ্ছে| ফলে আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করাকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা|
সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি শিল্প দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও গুরুত্ব দিচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর| গতকাল সোমবার বন্দর প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে শুরু হয়েছে দুই সপ্তাহব্যাপী রিজিওনাল ট্রেনিং কোর্স অন ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেফটি| চট্টগ্রাম বন্দর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত গ্লোবাল পোর্টস সেফটি প্রকল্প যৌথভাবে এই প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছে|
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর আহমেদ আমিন আব্দুল্লাহ এবং বাংলাদেশে ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জঁ-মার্ক সেরে-শার্লেটে| ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মোট ২০ জন কর্মকর্তা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছেন|
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা প্রশিক্ষণে বিশিষ্ট শিল্প নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অলিভিয়ার সালভির পরিচালনায় অংশগ্রহণকারীরা আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল, তরল জ্বালানি সংরক্ষণাগার, তেল-গ্যাস স্থাপনা এবং রাসায়নিক ডিপোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ পাবেন|
প্রশিক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে— ইউরোপীয় কমিশনের অউঅগ সফটওয়্যার ব্যবহার করে দুর্ঘটনার পূর্বাভাস ও ঝুঁকি বিশ্লেষণ| চজওগঅজওঝক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়া ও অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাব্য প্রভাব নিরূপণ| স্থানীয় তেল টার্মিনাল ও ডিপো পরিদর্শনের মাধ্যমে বাস্তব ঝুঁকি মূল্যায়ন|
আন্তর্জাতিক বিপজ্জনক পণ্য পরিবহন বিধিমালা (আইএমডিজি), গ্লোবাল হরমোনাইজ&ড সিস্টেম (জিএইচএস) এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা নির্দেশিকা বিষয়ে প্রশিক্ষণ|
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল প্রযুক্তি স্থাপন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; দক্ষ জনবলই সেটিকে কার্যকর করে তোলে| এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা বড় শিল্প দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করবেন| এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও সামুদ্রিক স্থাপনাতেও আধুনিক নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে উঠবে|
চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, নতুন কনটেইনার টার্মিনাল, ডিজিটাল বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং ¯^য়ংক্রিয় অপারেশন ব্যবস্থা| বিশ্লেষকদের মতে, এসব অবকাঠামো তখনই কার্যকর হবে, যখন একই সঙ্গে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক মানের শিল্প নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে| অর্থাৎ, নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এই দুই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই ভবিষ্যতের স্মার্ট, টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক চট্টগ্রাম বন্দর গড়ে উঠবে|
চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন দুটি উদ্যোগ কেবল প্রযুক্তি সংযোজন বা প্রশিক্ষণ আয়োজন নয়; বরং এটি নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার একটি মৌলিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত| বিশ্ববাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বন্দরগুলোর সক্ষমতা এখন আর শুধু জাহাজ খালাসের গতি দিয়ে মূল্যায়িত হয় না| ডিজিটাল অবকাঠামোর সুরক্ষা, শিল্প ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ এবং দক্ষ মানবসম্পদ—এসবই এখন একটি বন্দরের ˆবশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার প্রধান সূচক|
সেই বিবেচনায় সাইবার সিকিউরিটি সিস্টেম চালু এবং আন্তর্জাতিক শিল্প নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগ, যা ভবিষ্যতে নিরাপদ, নিরবচ্ছিন্ন ও আধুনিক বন্দর পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে|
