সংস্থাটির সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে, যা ২০১৫ সালের প্যারিস এগ্রিমেন্ট এর লক্ষ্যমাত্রার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানবসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এবং প্রাকৃতিক জলবায়ুগত প্রভাবের সম্মিলিত কারণে আগামী বছরগুলোতে পৃথিবীর উষ্ণতা আরও দ্রুত বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে আবহাওয়া, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর।
কতটা বাড়তে পারে তাপমাত্রা?
ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২০৩০ সময়ে বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) গড়ের তুলনায় ১.৩ থেকে ১.৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এর অর্থ হলো পৃথিবী ক্রমশ সেই সীমার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, যেটিকে বিজ্ঞানীরা জলবায়ু পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসীমা হিসেবে বিবেচনা করেন।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য এই পূর্বাভাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শক্তিশালী এল নিনো ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে দেশে তাপপ্রবাহের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব বাড়তে পারে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
অতিরিক্ত গরমে শ্রমজীবী মানুষের কর্মঘণ্টা কমে যেতে পারে, বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে এবং তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরা কৃষি খাতের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের যেকোনো এক বছরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা সাময়িকভাবে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনা ৯১ শতাংশ। যদিও একটি বছরের জন্য এই সীমা অতিক্রম করা মানেই প্যারিস চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যর্থ হওয়া নয়, তবে এটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের দ্রুতগতির একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।
এল নিনো আরও বাড়াতে পারে তাপমাত্রা
প্রতিবেদনের প্রধান লেখক ড. লিওন হারম্যানসনের মতে, ২০২৬ সালের শেষদিকে শক্তিশালী এল নিনো (El Niño) দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত এল নিনো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে এবং এর প্রভাব বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ওপর পড়ে।
যদি শক্তিশালী এল নিনো গড়ে ওঠে, তাহলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে। অতীতে দেখা গেছে, বড় ধরনের এল নিনো বছরের পর বছর ধরে তাপপ্রবাহ, খরা ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে দেয়।
আর্কটিকে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে আর্কটিক অঞ্চল। ডব্লিউএমওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী পাঁচ শীত মৌসুমে (নভেম্বর-মার্চ) আর্কটিকের তাপমাত্রা ১৯৯১-২০২০ সালের গড়ের তুলনায় প্রায় ২.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে।
এর ফলে ব্যারেন্টস সাগর, বেরিং সাগর এবং ওখোটস্ক অঞ্চলে সমুদ্রবরফ দ্রুত গলতে পারে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, বরফ গলার এই প্রবণতা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ভারসাম্যে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।
বৃষ্টিপাতের ধরনেও বড় পরিবর্তন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের ধরণ বদলে যাবে। কিছু এলাকায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বন্যা দেখা দিলেও অন্যত্র খরা আরও তীব্র হবে।
বিশেষ করে সাহেল (Sahel), উত্তর ইউরোপ, আলাস্কা ও সাইবেরিয়ার মতো অঞ্চলে বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পেতে পারে। বিপরীতে আমাজন অববাহিকায় বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে তীব্র খরার সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বৃহত্তম রেইনফরেস্ট অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
জলবায়ু সংকটের নতুন বাস্তবতা
ডব্লিউএমওর এই পূর্বাভাস স্পষ্ট করে যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এখন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি বর্তমান বাস্তবতা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন দ্রুত কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি জোরদার না করা হলে আগামী দশকগুলোতে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘনঘন ও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
বিশ্বের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখে এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও বড় জলবায়ু বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে।
