মূল সংবাদে যান
রাজনীতি

বিএনপিতে ‘ত্যাগী বনাম হাইব্রিড’ দ্বন্দ্ব: ১৭ বছরের সংগ্রামের পরও মূল্যায়নের সংকটে মাঠের কর্মীরা

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) ‘ত্যাগী বনাম হাইব্রিড’ সংকট হলো দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত ও আন্দোলনকারী নেতাদের বিপরীতে সুবিধাভোগী অনুপ্রবেশকারীদের দলের পদ-পদবি দখল করার দ্বন্দ্ব। গত ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে এই সমস্যাটি আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে, যেখানে মাঠের পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে নব্য সুবিধাভোগীরা সক্রিয় হচ্ছেন।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
বিএনপিতে ‘ত্যাগী বনাম হাইব্রিড’ দ্বন্দ্ব: ১৭ বছরের সংগ্রামের পরও মূল্যায়নের সংকটে মাঠের কর্মীরা

দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বর্তমানে এক নতুন ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি। মামলা, হামলা, কারাবরণ, আর্থিক ক্ষতি এবং সামাজিক চাপ মোকাবিলা করে দলকে টিকিয়ে রাখা ত্যাগী নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ এখন নিজেদের অবমূল্যায়িত মনে করছেন। তাদের অভিযোগ, দলের সুসময় ঘনিয়ে আসতেই ‘হাইব্রিড’, ‘সুবিধাবাদী’ এবং ‘দুধের মাছি’ হিসেবে পরিচিত নতুন মুখগুলো সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে নিচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, “সুসময়ে যারা দলে ভিড় করেন, তারা দুঃসময়ে কতটা পাশে থাকবেন—সেটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বহুবার দেখেছে। তাই বিএনপির ভবিষ্যৎ শক্তি নির্ভর করবে, দল কতটা সফলভাবে ত্যাগী ও পরীক্ষিত কর্মীদের মর্যাদা ফিরিয়ে আনতে পারে তার ওপর।”

রাজনীতি বিশ্লেষক, তৃণমূল নেতাকর্মী এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাতেও একই ধরনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমা হচ্ছে। কমিটি গঠন, পদায়ন, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এমনকি দলীয় স্মরণসভা ও গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনেও দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের পরিবর্তে নতুন প্রভাবশালী মুখদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আন্দোলনের মূল্য কোথায়?

ঢাকা মহানগর উত্তরের সাবেক ১০ নম্বর ওয়ার্ড (বর্তমান ১৪ নম্বর ওয়ার্ড) ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আলী আরশাদ মামুনের ভাষায়, দলের জন্য কারাবরণ, নির্যাতন এবং আর্থিক ক্ষতির বিনিময়ে যে ত্যাগ স্বীকার করা হয়েছে, তার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি।

তিনি জানান, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সময় কারাভোগ করেন। পরবর্তীতে ওয়ার্ড বিএনপি থেকে শুরু করে থানা পর্যায়েও দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু বর্তমানে সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের ভূমিকা প্রায় উপেক্ষিত।

একই ধরনের অভিযোগ করেন কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান। তার দাবি, আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রেখে ১৩টি মামলার আসামি হয়েছেন এবং প্রায় দুই বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। অথচ নতুন কমিটি গঠনের সময় তাদের বাদ দিয়ে এমন ব্যক্তিদের জায়গা দেওয়া হয়েছে, যাদের রাজনৈতিক অতীত সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন।

‘দুধের মাছিদের’ উত্থান

বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি হচ্ছে ‘দুধের মাছি’। এই শব্দ দিয়ে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হচ্ছে, যারা দীর্ঘ আন্দোলনের সময় রাজপথে অনুপস্থিত ছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর হঠাৎ সক্রিয় হয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে জায়গা করে নিচ্ছেন।

ঢাকা-১৫ আসনের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নেতারা অভিযোগ করেন, আন্দোলনের সময় যাদের দেখা যেত না, তারাই এখন দলীয় পদ-পদবি ও সাংগঠনিক সুবিধা ভোগ করছেন। তাদের মতে, রাজনৈতিক দুঃসময়ে পরীক্ষিত কর্মীদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীদের প্রাধান্য দেওয়া হলে দলীয় আদর্শ ও সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।

সাবেক ছাত্রনেতা ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আহসান উল্লাহ চৌধুরী হাসান বলেন, “আন্দোলনের সময় লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। আজ দুধের মাছিদের ভিড়ে ত্যাগীরা হারিয়ে যাচ্ছে। এটা দলের জন্য শুভ সংকেত নয়।”

অর্থনীতি ও রাজনীতির যোগসূত্র

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির বর্তমান সংকটের পেছনে রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কাজ করছে। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কাঠামো সচল রাখতে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়। মামলা পরিচালনা, নেতাকর্মীদের সহায়তা, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহে আর্থিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়।

এই সুযোগে অনেক ব্যবসায়ী ও সুবিধাবাদী ব্যক্তি দলীয় কাঠামোর ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান। তারা সরাসরি আন্দোলনে অংশ না নিলেও অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেন। ফলে ত্যাগী কর্মীদের পরিবর্তে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী নতুন গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে।

সিন্ডিকেট রাজনীতি ও অভ্যন্তরীণ বলয়

দলীয় সূত্র ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপির ভেতরে বিভিন্ন স্তরে একাধিক প্রভাবশালী বলয় বা সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এসব বলয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে স্পষ্টভাষী ও স্বাধীনচেতা নেতাদের দূরে সরিয়ে রাখে এবং অনুগত নতুন মুখদের সামনে নিয়ে আসে।

ফলে শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রকৃত সাংগঠনিক চিত্র অনেক সময় প্রতিফলিত হয় না। তৃণমূল পর্যায়ের ত্যাগী কর্মীদের ক্ষোভ ও বঞ্চনা ধীরে ধীরে সাংগঠনিক দুর্বলতায় রূপ নিতে শুরু করে।

একজন জেলা পর্যায়ের নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আন্দোলনের সময় পুলিশ আমাদের বাড়ি ঘেরাও করত। আর এখন কমিটি গঠনের সময় উড়ে এসে জুড়ে বসা লোকজন পদ পেয়ে যাচ্ছে। এতে মাঠের কর্মীরা হতাশ হয়ে পড়ছে।”

আদর্শিক সংকটের আশঙ্কা

বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সাংগঠনিক নয়, আদর্শিকও। কারণ দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর রাজনৈতিক দর্শনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

ত্যাগী কর্মীদের কাছে দলীয় আদর্শ, রাজনৈতিক দর্শন এবং নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও নতুন অনুপ্রবেশকারীদের একটি অংশের কাছে রাজনৈতিক অবস্থান অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির জায়গায় সুবিধাভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

সামনে কী চ্যালেঞ্জ?

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ স্বৈরশাসন বা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশের পর যেকোনো বড় দলেই পুনর্গঠনকালীন সময়ে এ ধরনের দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে। নতুন নেতৃত্বকে জায়গা দেওয়া এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দলে অন্তর্ভুক্ত করাও রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ।

তবে সেই প্রক্রিয়া যদি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের অবমূল্যায়নের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে দল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—মাঠপর্যায়ের নিবেদিত কর্মীবাহিনী—হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে।

তাদের মতে, বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক পরীক্ষা হলো ত্যাগ, মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং নতুন নেতৃত্বের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা। তৃণমূলের পরীক্ষিত কর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা না গেলে অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ আরও বাড়বে, যা ভবিষ্যতে দলীয় ঐক্য ও সাংগঠনিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পর্কিত বিষয়

  • বিএনপি
  • হাইব্রিড

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন