তবে অ¯^াভাবিক জোয়ার পরিস্থিতিকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন তিনি| গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের জুলাই বিপ্লব স্মৃতি হলে আয়োজিত ‘চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা : সংকটের উৎস ও নাগরিক দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মেয়র এসব কথা বলেন|
মেয়র বলেন, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর ও চকবাজারে পানি জমে মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল| কিন্তু ২০২৫ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে| “মানুষ আগের মতো কষ্ট পায়নি| কাজেই এত নিরাশ হওয়ার কিছু নেই,”| পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে এখন কার্যত ছয় মাসই বর্ষাকাল স্থায়ী হচ্ছে| এ বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জুন থেকে নভে¤^র পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে| তিনি বলেন, “আগে যেটা ষড়ঋতুর দেশ ছিল, এখন সেটা আর নেই| বর্ষা দীর্ঘ হচ্ছে| তাই ছয় মাসের পরিকল্পনা নিয়েই আমরা কাজ করছি|”
মেয়র বলেন, আপনাদের কি মনে নেই, বহদ্দারহাট থেকে রেজাউল করিম সাহেব বের হতে পারেননি কিংবা দেখেননি? তো ২৫ সালে বহদ্দারহাটে পানি উঠেছিল? উন্নতি হয়েছে তো, নাকি হয়নি? হয়েছে| আমি আপনাদেরকে কিন্তু এটা স্পষ্ট বলতে চাই, আপনারা যারা ¯^চক্ষে দেখেছেন ২৩-২৪ সালে বদ্দারহাট, মুরাদপুর, মির্জাপুর, চকবাজার পানির জন্য মানুষ বের হতে পারে নাই, ২৫ সালে মানুষ বের হতে পেরেছিল কিনা, পানির জন্য কষ্ট পেয়েছে কিনা? পায়নি| কাজেই আমাদের এত নিরাশ হওয়ার কী আছে? উন্নতি তো হয়েছে| শুধু এটুকুই বলছি চিন্তার কিছু নেই|
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বহদ্দারহাটের যে বড় মার্কেট থেকে ২০ লাখ টাকা ভাড়া পেতাম, যেটা নালার উপর দিয়ে মার্কেট করেছিল, সেটা আমি এক বাক্যে ভেঙে দিয়েছিলাম| যার কারণে বহদ্দারহাটে পানি নেই| এছাড়া আমাদের প্রস্তুতি হচ্ছে আগামী ৬ মাসের জন্য| কারণ আমাদের যে ষড়ঋতুর দেশ এখন আর ষড়ঋতুর দেশ নাই| গ্রীষ্মের পর বর্ষা, বর্ষার পরে শরৎ আর হেমন্ত আসে নাই গত বছরে| শরৎ হেমন্ত বর্ষার মধ্যে ঢুকে গেছে| ছয় মাস আমরা বর্ষাকাল দেখেছি| জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টে¤^র, অক্টোবর, নভে¤^রের শেষ পর্যন্ত কিন্তু বৃষ্টি পড়েছে| কাজেই এবারও আমরা ওই চিন্তা করে ছয় মাস নিয়ে আমরা চিন্তা করছিলাম যে জুনের ফার্স্ট উইক থেকে আমাদের নভে¤^র|
এদিকে জলাবদ্ধতা নিরসনে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম আরও জোরদার করতে নগরের গুরুত্বপূর্ণ খাল ও জলাশয় তদারকিতে ছয়টি পৃথক কমিটি গঠন করেছে চসিক| গত মঙ্গলবার জারি করা এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়| এসব কমিটির সার্বিক তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন চসিকের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও সচিব মো. আশরাফুল আমিন, প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী এবং প্রধান প্রকৌশলী আনিসুর রহমান| খাল ও এলাকা ভিত্তিকভাবে হিজরা খাল, জামালখান, রামপুর, গুলজার, মনোহরদি এবং চাঁদগাঁও-মুরাদপুর এলাকার জন্য পৃথক কমিটি করা হয়েছে| সংশ্লিষ্ট তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মকর্তাদের এসব কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে|
মেয়র জানান, গত বছর খাল-নালা পরিষ্কারের মাধ্যমে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ জলাবদ্ধতা কমানো সম্ভব হয়েছিল| এ বছর সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমšি^ত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে| তিনি বলেন, নগরীতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ড্রেন ও অসংখ্য খাল রয়েছে, যা নিয়মিত পরিষ্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ হকারদের বর্জ্য নালা-নর্দমায় ফেলার প্রবণতাকে দায়ী করেন মেয়র| তিনি বলেন, নিউ মার্কেট, স্টেশন রোড ও চকবাজার এলাকায় ফলমূলের উচ্ছিষ্ট ও অন্যান্য ময়লা সরাসরি নালায় ফেলার কারণে পরিষ্কারের পরও খাল-নালা দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে| এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সহযোগিতা চান তিনি|
মেয়র আরও বলেন, আজকে আমাদের মূল সমস্যা ওইখানেই, যারা সেদিন ৬ হাজার কোটি টাকা, ৯০০০ কোটি টাকা চুরি করে সিটি কর্পোরেশনকে এড়িয়ে জোর করে প্রকল্প নিয়েছিল| পরে তাদের সক্ষমতা নেই বলে তারা ভাড়া করেছে সেনাবাহিনী| সিডিএ চেয়ারম্যান মাত্র এসেছেন জুলাই-আগস্টের পরে, উনিও একজন ˆবপ্লবিক নেতা, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে উনি কিন্তু এসেছেন| সততার ব্যাপারে আমি বলতে পারি উনি অত্যন্ত অনেস্ট| কাজে আমি মনে করি এখানে আসলে কারো দোষ নেই|
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার নুরুল করিম বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সম্পন্ন করেছে| বাকি ৫ শতাংশ কাজ দ্রুত শেষ করার প্রক্রিয়া চলছে| তিনি জানান, ৩৬টি খালের অধিকাংশের খননকাজ শেষ হলেও হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কিছু অংশের কাজ এখনও বাকি রয়েছে|
সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবু সুফিয়ান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে জনগণকে কীভাবে আরও সচেতন করা যায়, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দিকনির্দেশনা এই সেমিনার থেকে পাওয়া গেছে| খাল-নালা দখলমুক্ত করা ও খালের পাড়ে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা অপসারণে বিশেষজ্ঞ নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে| একই সঙ্গে খাল ও নালায় ময়লা-আবর্জনা না ফেলার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে|
প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর এস এম নসরুল কদির, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি জেরিনা হোসেন, নগর পরিকল্পনাবিদ ইঞ্জি. দেলোয়ার মজুমদার, ইস্ট ডেল্টা ইউনিভার্সিটির সাবেক ভিসি ও ফোরাম ফর প্ল্যনড চট্টগ্রামের সভাপতি প্রফেসর ড. সিকান্দর খান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মো. শাহ নওয়াজ, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসেসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওসমান গণি মনসুর, রাশিয়ান অনারারী কনসালটেন স্থপতি আশিক ইমরান, ঈসা আনসারী, অভিক ওসমানসহ অন্যরা| জলাবদ্ধতা নিরসনে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, খাল-নালা দখলমুক্তকরণ, পলিথিন ব্যবহার বন্ধ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন|
সেমিনারে বক্তরা বেশকিছু সুপারিশ তুলে ধরেন| এরমধ্যে রয়েছে- নালা-খালে ময়লা ফেললে জরিমানা ও শাস্তির আওতায় আনা, শহরের গুরুত্বপূর্ণ নালা-খালে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নগরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ডাস্টবিন স্থাপন, নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলতে নগরবাসীর মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং পলিথিনমুক্ত শহর গড়ে তোলা|
