শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির মধ্যে ১১টিই চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান—যা দেশের ব্যাংকিং খাতে করপোরেট ঋণঝুঁকির গভীরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সোমবার (৬ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য তুলে ধরেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে এনসিপির সংসদ সদস্য আবুল হাসনাতের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
সংসদে দেওয়া তালিকা পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শীর্ষস্থানীয় ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১টিই এস আলম গ্রুপের। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে—এস আলম সুপার এডিবল অয়েল, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল, এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, সোনালী ট্রেডার্স, গ্লোবাল ট্রেডিং করপোরেশন, চেমন ইস্পাত, এস আলম ট্রেডিং কোম্পানি, ইনফিনিট সিআর স্ট্রিপস, মুরাদ এন্টারপ্রাইজ এবং কর্ণফুলী ফুডস (প্রা.) লিমিটেড।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এস আলম গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণই প্রায় ৯৫ হাজার কোটি টাকার বেশি। রাষ্ট্রায়ত্তসহ অন্তত ছয়টি ব্যাংক থেকে এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৯ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে একটি বেসরকারি ইসলামী ব্যাংক থেকে। এছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকেও ঋণ নিয়েছে গ্রুপটির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকও এস আলম গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বড় ঋণদাতা। ব্যাংকটির একটি শাখা থেকেই প্রায় ১০ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যার পুরোটাই এখন খেলাপি। একইভাবে ইসলামী ব্যাংক থেকে এস আলম কোল্ড রোলড স্টিলস, এস আলম ভেজিটেবল অয়েল ও পাওয়ার স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজার ৫৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
শীর্ষ খেলাপিদের তালিকায় থাকা অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো, কেয়া, দেশবন্ধু, সিকদার, মাইশা ও রংধনু গ্রুপ। তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেক্সিমকো গ্রুপের বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইম্পোর্ট কোম্পানি ও বেক্সিমকো কমিউনিকেশনস, কেয়া গ্রুপের কেয়া কসমেটিকস, দেশবন্ধু গ্রুপের দেশবন্ধু সুগার মিলস এবং সিকদার গ্রুপের পাওয়ার প্যাক মুতিয়ারা কেরানীগঞ্জ ও জামালপুর পাওয়ার প্ল্যান্ট উল্লেখযোগ্য।
এ তালিকায় রয়েছে দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেলের মালিকানাধীন প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেডও। ব্যবসা কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ঋণ এখন অনাদায়ী অবস্থায় রয়েছে।
সংসদে অর্থমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সংসদের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তবে আদালতের স্থগিতাদেশের কারণে এর একটি অংশ নিয়মিত হিসেবে দেখানো হতে পারে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শীর্ষ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর মালিকদের অবস্থান নিয়েও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম সপরিবারে বিদেশে পলাতক রয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সময় বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। সিকদার পরিবারের সদস্যরাও গত বছরের আগস্টের পর দেশ ছেড়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে সরকার একাধিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। নিয়মিত ব্যাংকার্স সভায় শীর্ষ খেলাপিদের অগ্রগতি পর্যালোচনা, ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তে নীতিমালা প্রণয়ন, আইন বিভাগ শক্তিশালী করা এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংক কোম্পানি আইন, অর্থঋণ আদালত আইন ও দেউলিয়া আইনে সংস্কারের প্রক্রিয়াও চলছে বলে সংসদকে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের হাতে বিপুল অঙ্কের ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়া দেশের ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। যথাযথ তদারকি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত না হলে খেলাপি ঋণের এই বোঝা অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
