মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

চবিতে ‘নিয়োগের বন্যা’: সংস্কার নাকি স্বজনপ্রীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ?

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়-এ মাত্র ৫৪৭ দিনে ৪২৫ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ—সংখ্যাটি নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি প্রবণতার প্রতীক। সদ্য বিদায়ী উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার-এর আমলে এই নিয়োগ যেন এক ধরনের ‘প্রশাসনিক তৎপরতা’র চেয়ে বেশি কিছু—বরং তা একটি প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
চবিতে ‘নিয়োগের বন্যা’: সংস্কার নাকি স্বজনপ্রীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ?

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় দশকের ইতিহাসে এমন নজির নেই। পাঁচটি সিন্ডিকেট বৈঠকে গড়ে ৮৫ জন করে নিয়োগ—যেখানে আগে বছরজুড়েও এত নিয়োগ হতো না। শুধু সংখ্যাই নয়, নিয়োগের গতি, সময় এবং পদ্ধতি—সবকিছু মিলিয়ে এটি এক ‘ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক আচরণ’, যার ব্যাখ্যা এখনো অস্পষ্ট।

আরও উদ্বেগজনক হলো—প্রথা ভেঙে জাতীয় ছুটির দিনেও সিন্ডিকেট বৈঠক ডাকা, শুক্রবারে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি প্রশাসনিক জরুরি প্রয়োজন, নাকি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণের তাড়াহুড়া?

সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে বিতর্কের বাস্তবতা

শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। লিখিত, মৌখিক ও প্রেজেন্টেশন—একদিনে সম্পন্ন করে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই প্রক্রিয়াই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

কারণ, অভিযোগগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন নয়—বরং ধারাবাহিক। উপ-উপাচার্যের মেয়ে, প্রভোস্টের ছেলে, রেজিস্ট্রারের ভাই—একই নিয়োগচক্রে এত ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ দেখা গেলে সেটিকে আর কাকতালীয় বলা কঠিন।

এখানেই উঠে আসে মূল প্রশ্ন—যোগ্যতা কি প্রধান ছিল, নাকি পরিচয়?

নীতিমালা বদল: প্রয়োজন, নাকি সুবিধাভোগীর জন্য পথ তৈরি?

নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মানদণ্ড কমানো—৩.৫০ থেকে ৩.৪০—একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন দেখা যায়, এই পরিবর্তনের পরপরই নির্দিষ্ট প্রার্থী নিয়োগ পাচ্ছেন, তখন তা কেবল নীতিমালা সংশোধন নয়; বরং ‘targeted adjustment’-এর ইঙ্গিত দেয়।

একইভাবে, কোনো বিভাগের প্ল্যানিং কমিটি শিক্ষক প্রয়োজন নেই বলার পরও সেখানে একাধিক নিয়োগ—এটি শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি একাডেমিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নও তুলে দেয়।

নিয়োগ বোর্ড: নিরপেক্ষতা নাকি প্রভাবের বলয়?

নিয়োগ বোর্ড গঠনের ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য ও নিরপেক্ষতা থাকা উচিত। কিন্তু অভিযোগ বলছে—বোর্ড সাজানো হয়েছে ‘পছন্দের’ সদস্য দিয়ে। কোনো ক্ষেত্রে পুরো বোর্ড একই বিভাগের, আবার কোথাও সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকই নেই।

এ ধরনের বৈপরীত্য শুধু প্রশ্নই তোলে না; বরং নিয়োগের বৈধতাকেই দুর্বল করে।

প্রশাসনিক ক্ষমতা বনাম নৈতিক দায়

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একাধিকবার নিয়োগ স্থগিত রাখতে বলেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্তে নেমেছে—এগুলো কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এগুলো ইঙ্গিত দেয়, বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; বরং রাষ্ট্রীয় নজরদারির পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তারপরও নিয়োগ প্রক্রিয়া থামেনি—এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

৪২৫ জনের মধ্যে ৬৬ শতাংশ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। শিক্ষক নিয়োগ মাত্র ২৯ শতাংশ। এই অনুপাতও ভাবনার খোরাক জোগায়—বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য কি প্রশাসনিক সম্প্রসারণ, নাকি একাডেমিক শক্তিশালীকরণ? অন্যদিকে, একটি নির্দিষ্ট জেলার (নোয়াখালী) প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি আবারও আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্ন তুলছে।

উপাচার্যের দাবি—সব নিয়োগ হয়েছে যোগ্যতার ভিত্তিতে, নতুন হল চালু হওয়ায় জনবল প্রয়োজন ছিল। নিয়োগপ্রাপ্তদের বক্তব্য—তারা মেধার ভিত্তিতেই নির্বাচিত। প্রশাসনের বক্তব্য—অনিয়ম পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই ব্যাখ্যাগুলো কি অভিযোগের ভার কমাতে পারছে?

নতুন উপাচার্য মোহাম্মদ আল-ফোরকান তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু শুধু তদন্ত নয়—প্রয়োজন একটি দৃষ্টান্ত।

কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি। সেখানে যদি নিয়োগই প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ঘটনাটি তাই কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ইস্যু নয়; এটি বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার একটি প্রতিচ্ছবি।

প্রশ্ন এখন একটাই— এই প্রতিচ্ছবি কি আমরা মেনে নেব, নাকি পরিবর্তনের সাহস দেখাব?

সম্পর্কিত বিষয়

  • চবিতে ‘নিয়োগ
  • স্বজনপ্রীতি
  • উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহ্‌ইয়া আখতার

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন