মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

হরমুজের দোরগোড়ায় যুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ কি দোরগোড়ায়?

মধ্যপ্রাচ্য আবারও অগ্নিপরীক্ষার মুখে। ইরান সরাসরি সতর্ক করেছে—ওয়াশিংটন যদি তাদের ঘোষিত ‘রেড লাইন’ অতিক্রম করে, তবে সংঘাত আর সীমাবদ্ধ থাকবে না এই অঞ্চলে; তা ছড়িয়ে পড়বে বৈশ্বিক পরিসরে। এই বার্তা কেবল কূটনৈতিক ভাষা নয়, বরং একটি সম্ভাব্য বিশ্বসংকটের খোলামেলা ইঙ্গিত।

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
হরমুজের দোরগোড়ায় যুদ্ধ, বিশ্বযুদ্ধ কি দোরগোড়ায়?

ইরানের অভিজাত সামরিক বাহিনী Islamic Revolutionary Guard Corps (আইআরজিসি)-এর বক্তব্যে স্পষ্ট—এ লড়াই শুধু সামরিক নয়, বরং জ্বালানি ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের তেল-গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি মূলত বিশ্বের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জ্বালানি করিডর—হরমুজ প্রণালি—কে ঘিরেই।

প্রতিদিন বৈশ্বিক তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে অতিক্রম করে। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও বিশ্ববাজারে তীব্র ধাক্কা দিতে পারে। ইরানের কৌশলগত বার্তা তাই দ্ব্যর্থহীন—যুদ্ধ হলে তা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের সংঘর্ষে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি হবে জ্বালানি প্রবাহের ওপর সরাসরি আঘাত।

অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর হুমকি পরিস্থিতিকে বিপজ্জনকভাবে উসকে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালি খোলা না হলে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে তাৎক্ষণিক হামলার ঘোষণা—এটি নিছক চাপ প্রয়োগ নয়; বরং তা এক ধরনের ‘pre-emptive strike’-এর ইঙ্গিত, যা সংঘাতকে মুহূর্তেই পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ দিতে পারে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক—টার্গেট হিসেবে বেসামরিক অবকাঠামোর উল্লেখ। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনে এ ধরনের আঘাত অত্যন্ত বিতর্কিত, এবং এর প্রতিক্রিয়া সাধারণত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

ইরানের প্রতিক্রিয়াও সমান কড়া। তারা স্পষ্ট করে দিয়েছে—যদি যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে পাল্টা আঘাত শুধু সমান হবে না, বরং বিস্তৃত হবে—সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি ছাড়িয়েও।

এটি নিছক হুমকি নয়; এটি ‘escalation doctrine’-এর বাস্তব প্রয়োগ—যেখানে প্রতিপক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়, যুদ্ধের খরচ এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যা কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

এই মুহূর্তে বিশ্ব তিনটি মৌলিক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে—

প্রথমত, এটি কি বাস্তব যুদ্ধের পূর্বাভাস, নাকি উচ্চমাত্রার কূটনৈতিক চাপ? দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালি অচল হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার কতটা ধাক্কা খাবে? তৃতীয়ত, এই সংঘাত কি বৃহৎ শক্তিগুলোর সরাসরি মুখোমুখি অবস্থান তৈরি করবে?

ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কখনও সীমাবদ্ধ থাকে না। এখানে প্রতিটি আঘাতের প্রতিক্রিয়া বহুগুণে ফিরে আসে—রাজনৈতিকভাবে, সামরিকভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখন ‘miscalculation’—ভুল হিসাব। যখন দুই পক্ষই শক্তি প্রদর্শনে প্রতিযোগিতায় নামে, তখন একটি ভুল সিদ্ধান্তই যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।

বর্তমান বাস্তবতা সেই বিপজ্জনক প্রান্তরেই দাঁড়িয়ে আছে।

বিশ্ব এখন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর ঝুলে আছে—যেখানে একটি প্রণালি, একটি নির্দেশ, কিংবা একটি ভুল আঘাত পুরো বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে।

শেষ প্রশ্নটি তাই আগের চেয়ে আরও তীক্ষ্ণ— এই উত্তেজনা কি কূটনীতির টেবিলে থামবে, নাকি ইতিহাসের আরেকটি বৈশ্বিক সংঘাতের সূচনা হতে যাচ্ছে?

সম্পর্কিত বিষয়

  • হরমুজ
  • বিশ্বযুদ্ধ
  • আইআরজিসি

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন