মূল সংবাদে যান
অর্থ বাণিজ্য

যন্ত্রাংশ চুরিতে অচল ইঞ্জিন, ঝুঁকিতে ট্রেন চলাচল

*রেল ও নৌ-পথকে সংকুচিত করার পরিকল্পনার কবলে রেল সম্পদ *চুরির পয়েন্ট আখাউড়া, ভৈরব, টঙ্গী ও জয়দেবপুর *সারাদেশে অরক্ষিত ৫০০ স্টেশন

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল
যন্ত্রাংশ চুরিতে অচল ইঞ্জিন, ঝুঁকিতে ট্রেন চলাচল

একটি অসৎ চক্র দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়েকে অবহেলা করতে শিখিয়েছে। রেল যোগাযোগ পরিবেশ বান্ধব, অর্থনৈতিকভাবে সাশ্রয়ী এবং একসঙ্গে বহু মানুষ ও মালামাল পরিবহন করতে পারে বলে পৃথিবীর সর্বত্র রেলখাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও বাংলাদেশে ঘটেছে উল্টোটি।

এখানে সড়ক যোগাযোগকে প্রাধান্য দিতে অসাধু চক্র সক্রিয় ছিল। তারা পরিকল্পিতভাবে রেল ও নৌ-পথকে নানা উপায়ে সংকুচিত করেছে। তাদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রেলকে লোকসানের খাতে নামিয়ে এনে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সোপর্দ করা। একই সঙ্গে সড়কে চলাচলকারী বাসগুলোর মুনাফা নিশ্চিত করা তাই কৌশলে এই কথাটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়-‘নটার ট্রেন কটায় যাবে’?

রেলসূত্র বলছে, সারাদেশে রেল কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ৫৩৩টি রেল স্টেশন রয়েছে। এই সব স্টেশন ও চলন্ত ট্রেন ও মেরামতের কারখানায় প্রতিনিয়ত রেলের যন্ত্রাংশ, তার ও এসির বিভিন্ন পার্টস চুরি এখন নিত্য-নৈমত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি এই ধরনের ১৫ থেকে ২০টি চুরির ঘটনা ঘটছে। আর কারখানায় চুরির ঘটনায় রেলওয়ে উচ্চপর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

রেল ভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলছেন, চুরির কারণে ট্রেন চলাচলে নানামুখী সমস্যায় পড়ছে। যা মেরামত করতে কয়েক মাসও সময় লেগে যাচ্ছে যার কারণে সিডিউল ব্যহত হচ্ছে। বর্তমানে চুরির কারনে রেলওয়ের ১টি ইঞ্জিন বন্ধ রাখা হয়েছে। ঘটনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে গত এক মাসে ১৫ থেকে ২০টি চুরির ঘটনা রেল ভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে এসেছে।

এছাড়াও আরো ছোটখাট অনেক চুরির ঘটনা থানা পর্যন্ত পৌঁছায় না। যদিও বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হয়েছে আবার অনেকেই অহেতুক ঝামেলা মনে করে মামলা করা থেকে বিরত থাকেন। তবে এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করছে চুরি ঠেকানো রেল কর্তৃপক্ষের এখন বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

রেল পুলিশের প্রধান কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রেলওয়ের যন্ত্রাংশ চুরি হওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, প্রায় চুরির খবর আসছে। অনেক ঘটনা রেল কর্তৃপক্ষ মামলা না করলেও পুলিশ বাদি হয়ে অভিযোগ করে তদন্ত করছেন।

সম্প্রতি চুরির ঘটনায় কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। চোরদল জয়দেবপুর থেকে টঙ্গী, ভৈরবসহ বিভিন্ন স্থানে রেলওয়ের যন্ত্রাংশ চুরি করছে। আবার চলন্ত ট্রেনের ছাদে থেকে এসি কেবিনের যন্ত্রাংশ চুরি হয়। ট্রেনের ক্যাবল (তার) চুরির ঘটনা ঘটছে। তদন্ত করে ইতোমধ্যে কয়েকটি চুরির ঘটনা তদন্ত ও চোর গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে রেল পুলিশের ডিআইজি জানিয়েছেন।

রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের একজন কমাডেন্ট বলেন, সারাদেশে প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার রেলপথ, ৫০০ বেশি স্টেশন, ইঞ্জিন মেরামতের কারখানা ৪টি, বগি মেরামতের কারখানা ২টি। আর ছোট ছোট মেরামতের কারখানা রয়েছে। এই সব কারখানাও চুরির ঘটনা ঘটছে। পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, পাহড়াতলী, ঢাকায় কারখানা আছে। চোরদল পার্বতীপুর থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত চলন্ত ট্রেনের ছাদে উঠে যন্ত্রপাতি চুরি করছে। আখাউড়া, ভৈরব, টঙ্গী ও জয়দেবপুরে চুরির ঘটনার তথ্য রয়েছে। চোর লোহার টুকরো, ক্যাবল চুরি করে নিয়ে যায়। ক্যাবলের ভিতর থেকে তামার তার বের করে তা কেজি হিসাবে বিক্রি করে দেয়। আবার ছোটখাট লোহার টুকরোগুলো চুরি করে কেজি হিসাবে বিক্রি করে দিচ্ছে। ট্রেনের ছাদে, চলন্ত ট্রেনে ও স্টেশনে এই সব চুরি অহরহ হচ্ছে।

রেলওয়ের নিজস্ব নিরাপত্তার চীফ কমান্ডেন্ট আশাবুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, ট্রেনের ছাদে উঠে চুরি বন্ধ করতে এখন ছাদে উঠানো বন্ধ করার চেষ্টা চলছে। অনেক সময় পরিত্যক্ত বা কেটে লোহার যন্ত্রাংশ চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে।

রেলওয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব প্রাপ্ত কমান্ডেন্ট বলেন, সারাদেশে ৫০০ বেশি রেল স্টেশন ও ৬টি কারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনার নিরাপত্তায় ৩ হাজার ৪শ জনবল মঞ্জুরী আছে। তার মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছে এক হাজার ৭০০ জন (১৭০০) জন। এত কম জনবল দিয়ে রেল স্টেশন, চলন্ত ট্রেনের নিরাপত্তা দেয়া কষ্টকর। এরপরও আবার রেলওয়ের বিভিন্ন ডিপোর মালামালও রয়েছে।

এরমধ্যে ক্যাবল চুরি ঠেকাতে মাঝে মধ্যে রেলওয়ের নিরাপত্তা কর্মীরা ট্রলিতে করে পেট্রোল ডিউটিও করেন। রেলওয়ের আউটার সিগনালের যন্ত্রাংশ লোহার খাঁচা দিয়ে আটকে রাখলেও তাও মানছে না। সেখান থেকেও চুরি হচ্ছে। ৫০০ স্টেশন পালাক্রমে পাহারা দিতে হয়। এরমধ্যে চোরদল ক্যাবল, এসির যন্ত্রণাংশ, বগি সংযোগের লোহার যন্ত্রাংশ, সিগনালের জিনিসপত্র চুরি হচ্ছে। এই সব জিনিস কেজি হিসাবে বিক্রি করছে। ভৈরবে কিছুক্ষণের জন্য ট্রেন থামলে, সেখান থেকে কৌশলে চোরদল চলন্ত ট্রেনের সংযোগ নাট খুলে নিয়ে যায়। আর এর জন্য ট্রেন চলাচল বন্ধ ও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রেলওয়ের যন্ত্রাংশ চুরি এখন বড় সমস্যা। আগেও চুরি হত। সম্প্রতি চুরি বেড়ে গেছে। চুরি না হলে রেল ভবন পর্যন্ত খবর আসে না। এছাড়াও ছোটখাট ঘটনা প্রায় হচ্ছে। রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনী ও রেল পুলিশকে অনেক ঘটনা জানানো হয়েছে। আবার অনেকে ঘটনায় এলাকার দায়িত্ব প্রাপ্তরা অভিযোগও করে না। চুরি ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

চুরি সম্পর্কে জিআরপি থানার ওসিদের সঙ্গে কথা বললে তারা বলছেন, চুরির ঘটনায় থানা মামলা করতে চাইলে পুলিশ মামলা নিবে এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নিবেন। এ সম্পর্কে রেল পুলিশের ঢাকাস্থ সদর দপ্তর থেকে একজন ডিআইজি বলেন, চুরির ঘটনায় সম্প্রতি কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর বিভিন্ন স্থানে চুরি হচ্ছে স্বীকার করেন তিনি।

সম্পর্কিত বিষয়

  • ট্রেন
  • নৌ-পথ

আমাদের বাংলা সম্পাদকীয় দল

আমাদের বাংলা-এ প্রকাশিত সংবাদ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন