মাত্র গত ডিসেম্বর মাসে প্রকাশিত দুটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে মোট ৩২৯টি পদে জনবল নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। এমনকি উপেক্ষিত হাইকোর্টে চলমান রিট মামলা। অথচ তিন বছর আগে নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৭ জন প্রার্থীর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়েই নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং তড়িঘড়ি পরীক্ষা আয়োজনকে কেন্দ্র করে উঠেছে অনিয়ম, দ্বৈতনীতি ও আর্থিক বাণিজ্যের অভিযোগ।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল চট্টগ্রাম ওয়াসা ‘সহকারী প্রকৌশলী’ ও ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের সংখ্যা উল্লেখ না থাকলেও ২০২৩ সালের ১২ মে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সহকারী প্রকৌশলী পদে ৩৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ এবং ১৮ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণার পর হঠাৎ করেই পুরো প্রক্রিয়া থেমে যায়। কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই মৌখিক পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
একই সময়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের লিখিত পরীক্ষা হলেও তার ফলাফল আজ পর্যন্ত প্রকাশ পায়নি। অথচ ওই পরীক্ষা আয়োজনেই ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২২ লাখ টাকা। সহকারী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের বিপরীতে হাইকোর্টে রিট মামলা চলমান রয়েছে। তা সত্ত্বেও সাংগঠনিক কাঠামো-২০১৬ অনুসরণ করে নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অথচ ২০২২ সালে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাংগঠনিক কাঠামো-২০২০ অনুসরণ করা হয়েছিল—যা নিয়ে দ্বৈতনীতির অভিযোগ উঠেছে।
ওয়াসার ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, লিখিত পরীক্ষায় প্রশাসন ও সিন্ডিকেট-ঘনিষ্ঠ প্রার্থীরা উত্তীর্ণ না হওয়ায় মৌখিক পরীক্ষা না নিয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে মেধার ভিত্তিতে উত্তীর্ণ প্রার্থীরা তিন বছর ধরে ঝুলে আছেন—নিয়োগও নেই, বাতিলের ঘোষণাও নেই। পুরোনো প্রক্রিয়া নিষ্পত্তি না করেই ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর আবারও একই পদে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এবার রাজস্ব খাতের ২৪টি ক্যাটাগরিতে মোট ৩২৯টি পদে নিয়োগের ঘোষণা দেওয়া হয়। সহকারী প্রকৌশলী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের পরীক্ষার দায়িত্ব আবারও চুয়েটকে দেওয়া হয়েছে।
তবে এবার পরীক্ষার ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা (ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যতীত), যা আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। চুয়েট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৯ হাজার ৪০৮ জন প্রার্থীর পরীক্ষার জন্য এই অর্থের ৮০ শতাংশ অগ্রিম প্রদান করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রাম ওয়াসার রাজস্ব খাতের ২৪টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। স্মারক নম্বর ৪৬.০৬.০০০০.১০৩.১০৪.৭৬৯.১৬ (পার্ট-১১)-১৪৯৬ ও ১৪৯৭ অনুযায়ী বিজ্ঞপ্তিতে সহকারী প্রকৌশলী (৯ জন), উপ-সহকারী প্রকৌশলী (১৪ জন), গবেষণা কর্মকর্তা, রাজস্ব কর্মকর্তা, কম্পিউটার অপারেটর, অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, জুনিয়র হিসাব সহকারী, মিটার পরিদর্শক, অপারেটর ও নিরাপত্তা প্রহরীসহ বিভিন্ন স্তরের পদ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আবেদন গ্রহণ শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ৩১ ডিসেম্বর। বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ থেকে ৩২ বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ অনুযায়ী)।
ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক কাঠামো-২০১৬ অনুসরণ করে এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে। ওই কাঠামো অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী পদে সাতটি এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে ১৪টি শূন্য পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই দুটি পদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্টে রিট মামলা চলমান রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই রিটের বিষয়টি উপেক্ষা করেই নিয়োগ পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াসা।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল একই ‘সহকারী প্রকৌশলী’ ও ‘উপ-সহকারী প্রকৌশলী’ পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। ওই বিজ্ঞপ্তিতে শূন্য পদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। এর পর ২০২৩ সালের ১২ মে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সহকারী প্রকৌশলী পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৩৭ জন প্রার্থী উত্তীর্ণ হন। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হয় এবং ১৮ ডিসেম্বর মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু রহস্যজনকভাবে সেই মৌখিক পরীক্ষা আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, ওয়াসা প্রশাসন ও সিন্ডিকেটের পছন্দের প্রার্থীরা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত করা হয়। একই সময়ে উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলেও তার ফলাফল আজও প্রকাশ করা হয়নি। ওই সময় পরীক্ষা আয়োজনের জন্য ওয়াসার ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২২ লাখ টাকা।
এদিকে পুরোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ রেখেই ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আবার একই পদে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয় এবং পরীক্ষা আয়োজনের দায়িত্ব পুনরায় চুয়েটকে দেওয়া হয়। এবার পরীক্ষার ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ টাকা (ভ্যাট ও ট্যাক্স ব্যতীত)। চুয়েটের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. শেখ মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত ২১ জানুয়ারির এক চিঠিতে ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক শারমিন আলমকে জানানো হয়, ৯ হাজার ৪০৮ জন প্রার্থীর জন্য প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, সিট বসানো, পরিদর্শক নিয়োগ, উত্তরপত্র মূল্যায়ন ও ফল প্রকাশের জন্য এই অর্থের ৮০ শতাংশ অগ্রিম এবং বাকি ২০ শতাংশ ফল হস্তান্তরের সাত দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।
আগামীকাল ৩১ জানুয়ারি চুয়েট ক্যাম্পাসে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সকাল ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী এবং দুপুর ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সহকারী প্রকৌশলী পদের পরীক্ষা নেওয়া হবে। দুই পদে মোট আবেদনকারী ৯ হাজার ৪০৮ জন। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার মাত্র পাঁচ দিন আগে গত ২৬ জানুয়ারি অফিস সময় শেষ হওয়ার পর টেলিটকের মাধ্যমে এসএমএস পাঠিয়ে পরীক্ষার নোটিশ দেওয়া হয়। এত অল্প সময়ে পরীক্ষা আয়োজনকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন অনেকে। তাছাড়া দুটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলেও নির্বাচনের আগে কেবল প্রকৌশলী পদের পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনের আগে এত বড় নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক চাপ বাড়বে, কিন্তু সেবার মান বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। বরং একটি মহলের আর্থিক লাভের সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে তারা মনে করেন।
২০২৫ সালের নিয়োগে সাংগঠনিক কাঠামো-২০১৬ অনুসরণ করা হলেও ২০২২ সালের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে কাঠামো-২০২০ অনুযায়ী। এতে প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দ্বৈতনীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের প্রভাব স্পষ্ট। এছাড়া নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মবিবরণী (জব ডেসক্রিপশন), দায়িত্ব বণ্টন বা কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার নির্দেশনা নেই বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে নিয়োগের পর অনেকেই কার্যত অলস থাকতে পারেন, যা সেবাব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ারা বেগম বলেন, আগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কেন মৌখিক পরীক্ষা নেননি, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন এবং সেই দায়ভার নিতে রাজি নন। তাঁর ভাষ্য, ওয়াসায় প্রকৌশলীর ঘাটতি রয়েছে এবং প্ল্যান্ট পরিচালনার জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রকৌশলী নিয়োগ প্রয়োজন।
রাজস্ব খাতে প্রকৌশলী নিয়োগ প্রসঙ্গে মনোয়ারা বেগম বলেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্য পদের বিপরীতে ওয়াসা বোর্ডের সিদ্ধান্তেই এই নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে এবং চুয়েটে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তবে কোনো ধরনের লেনদেন হয়নি। কেউ যদি টাকা দেওয়া বা নেওয়ার প্রমাণ দেখাতে পারে, আমাকে জানাক। শুধু উড়ো অভিযোগ করলে হবে না।
