মোট আমদানিকৃত পণ্যের ৫২ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বন্দরের অভ্যন্তরে এবং বাকি ৪৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে। বহির্নোঙরে খালাস হওয়া পুরো পণ্যই পরিবাহিত হয় লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে।

প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার করে ফিক্সড অপারেটিং কস্ট দিতে হচ্ছে। প্রতিদিন বাড়ছে অপেক্ষমাণ মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে জাহাজের অবস্থানকাল। পণ্যবোঝাই জাহাজগুলো অলস পড়ে থাকায় আসন্ন রমজানে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, লাইটারেজ জাহাজ খাতকে ঘিরে সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা, মালিক সংগঠনগুলোর অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং প্রশাসনিক উদাসীনতায় এই গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরেই বিশৃঙ্খলা চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আমদানিকারকরা মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাত উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি সিন্ডিকেট করে চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে নেয়া জাহাজগুলো দ্রুত ফিরিয়ে আনতে জরুরি সরকারি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা। তাছাড়া ৪১টি ঘাটের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, শ্রমিক সংকট এবং কিছু ক্ষেত্রে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার কারণে জাহাজগুলো দ্রুত ফ্রি হতে পারছে না।
জানা গেছে, দেশের আমদানি বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই পরিচালিত হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে। এর মধ্যে মোট আমদানিকৃত পণ্যের ৫২ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বন্দরের অভ্যন্তরে এবং বাকি ৪৮ শতাংশ হ্যান্ডলিং হয় বহির্নোঙরে। বহির্নোঙরে খালাস হওয়া পুরো পণ্যই পরিবাহিত হয় লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে। তবে বন্দরের অভ্যন্তরে আধুনিক ইকুইপমেন্ট থাকলেও বহির্নোঙরে তেমন অবকাঠামো নেই। জাহাজের নিজস্ব ক্রেন, গিয়ার, গ্রাব ও পে-লোডারের মতো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেই বছরে কয়েক কোটি টন পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়।
সাধারণ সময়ে বহির্নোঙরে একটি মাদার ভ্যাসেলের পণ্য খালাসে সময় লাগত ৭ থেকে ১০ দিন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এক মাসেও পণ্য খালাস না হওয়া মাদার ভ্যাসেল দেখা যাচ্ছে। আগে যেখানে বহির্নোঙরে গড়ে ৪০টির মতো পণ্যবাহী জাহাজ অপেক্ষায় থাকত, সেখানে এখন সেই সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে। এতে জাহাজভাড়া ও ডেমারেজ বাবদ আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি ডলার।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চট্টগ্রাম বন্দরের ইমেজ নিয়েও তৈরি হয়েছে সংকট। বড় আকারের মাদার ভ্যাসেলগুলো বন্দরের জেটিতে ভিড়তে না পারায় সেগুলো বহির্নোঙরে অবস্থান করে লাইটারেজ জাহাজে পণ্য খালাস করে। একটি মাদার ভ্যাসেল থেকে একসঙ্গে তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজে পণ্য নামানোর সুযোগ থাকলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় জাহাজ মিলছে না। খালাস হওয়া পণ্য কর্ণফুলী নদীর ১৬টি ঘাটসহ দেশের অন্তত ২৫টি এলাকার ৪১টি ঘাটে পাঠানো হয়। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য পরিবহনে প্রায় দেড় হাজার লাইটারেজ জাহাজ থাকলেও বর্তমানে বড় একটি অংশ কার্যক্রমের বাইরে।
লাইটারেজ জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেল (বিডব্লিউটিসিসি) নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন বার্থিং সভা করে মাদার ভ্যাসেলের বিপরীতে জাহাজ বরাদ্দ দেয়। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নিয়মিত বার্থিং সভাই হচ্ছে না। ফলে যেখানে প্রতিটি মাদার ভ্যাসেলের জন্য দৈনিক তিন থেকে চারটি লাইটারেজ জাহাজ প্রয়োজন, সেখানে অনেক ক্ষেত্রে একটি জাহাজও পাওয়া যাচ্ছে না। এতে বহির্নোঙরে হাজার হাজার টন পণ্য নিয়ে জাহাজগুলো অলস বা সীমিত পরিসরে কাজ চালাচ্ছে।
রমজানের পণ্য নিয়ে আসা বহু মাদার ভ্যাসেল লাইটারেজ জাহাজের অভাবে অপেক্ষার প্রহর গুনছে। এসব জাহাজকে প্রতিদিন গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার করে ফিক্সড অপারেটিং কস্ট দিতে হচ্ছে। লাইটারেজ সংকট না কাটলে এসব জাহাজে থাকা ভোগ্যপণ্য সময়মতো বাজারে আসা নিয়েই বড় ধরনের সংশয় তৈরি হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, বিডব্লিউটিসিসিকে কেন্দ্র করে লাইটারেজ জাহাজ মালিকদের তিনটি সংগঠনের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে। কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর এই বিরোধ আরও ঘনীভূত হয়। এর জেরে ঢাকাকেন্দ্রিক অনেক মালিক তাদের জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে মোংলা, পায়রা ও ভারতে সরিয়ে নিয়েছেন।
অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন স্থানের ৪১টি ঘাটে অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শ্রমিক সংকটের কারণে পণ্যবোঝাই অনেক জাহাজ আটকে আছে। কিছু আমদানিকারকের বিরুদ্ধে জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠলেও আমদানিকারকরা তা নাকচ করেছেন। তাদের দাবি, মাদার ভ্যাসেল থেকে পণ্য খালাস করে ঘাটে পৌঁছাতে ও সেখানে খালাস করতেই সাধারণত ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগে, যা অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে কখনো ২৫ দিনেও গড়ায়।
সংকটের কথা স্বীকার করে বিডব্লিউটিসিসির নির্বাহী পরিচালক মেজর (অব.) জিএম খান বলেন, রমজান সামনে রেখে হঠাৎ করেই মাদার ভ্যাসেলের সংখ্যা ৮০ ছাড়িয়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। পাশাপাশি ৪৫০টির বেশি লাইটারেজ জাহাজ মোংলা, পায়রা ও ভারতে চলে যাওয়ায় সংকট তীব্র হয়েছে। গম ও সারবোঝাই প্রায় ১৫০টি জাহাজ ভাসমান গুদাম হিসেবে আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
একাধিক শিল্পপতি অভিযোগ করেছেন, জাহাজ বরাদ্দে পক্ষপাত ও দুর্নীতি হচ্ছে। তাদের মতে, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন খাত উন্মুক্ত করা হলে আমদানিকারকরা নিজেরাই বাজার থেকে জাহাজ সংগ্রহ করতে পারতেন এবং এই অচলাবস্থা তৈরি হতো না।
শিপিং এজেন্টস এসোসিয়েশনের নেতা ও সেভেন সী’জ শিপিং লাইন্সের সিইও আলী আকবর বলেন, মাদার ভ্যাসেলের অবস্থানকাল বাড়ছে, খরচ বাড়ছে—এর চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়বে ভোক্তার ওপর। সব মিলিয়ে লাইটারেজ জাহাজ সংকট এখন শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়; এটি রমজানপূর্ব বাজার ব্যবস্থাপনা, ভোগ্যপণ্যের দাম এবং চট্টগ্রাম বন্দরের আন্তর্জাতিক সুনামের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত সমন্বিত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর হস্তক্ষেপ না এলে সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
