তাই ডলার সাশ্রয় তথা বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সম্ভাবনাসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে অগ্রযাত্রার লক্ষ্য সামনে রেখে চট্টগ্রামে অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ও সরকারের যৌথ অর্থায়নে বাস্তবায়নযোগ্য ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ (ইআরএল-২)’ প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
ঢাকায় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। ক্রুড অয়েল আমদানি করে দেশে পরিশোধন করা গেলে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব হবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একইসাথে ইউরো-৫ মানের জ্বালানি ব্যবহারে যানবাহন থেকে নির্গত ক্ষতিকর গ্যাস কমে আসবে, যা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ইতিবাচক।
সূত্রে জানা যায়, ইআরএল-২ প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে সরকার দেবে ২১ হাজার ২৭৭ কোটি টাকা এবং বিপিসি নিজস্ব তহবিল থেকে যোগান দেবে ১৪ হাজার ১৮৭ কোটি টাকা। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে করে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি কমবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে দেশে বছরে ৭০ লাখ টনের বেশি জ্বালানি তেলের চাহিদা থাকলেও রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সর্বোচ্চ পরিশোধন সক্ষমতা মাত্র ১৫ লাখ টন। ফলে প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিশোধিত অবস্থায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হচ্ছে। এতে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
বিপিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, “দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের প্রকল্প অবশেষে অনুমোদন পেল। পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘদিন ধরেই চাপ তৈরি হচ্ছিল। ইআরএল-২ বাস্তবায়িত হলে দেশে ক্রুড অয়েল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।”
দীর্ঘসূত্রতার অবসানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রসংশনীয় এ উদ্দ্যোগ নিতে বাধ্য হয়। ১৯৬৮ সালে নির্মিত ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়াতে ২০১০ সালে দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সে সময় প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থায়ন জটিলতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় ১৫ বছর ধরে প্রকল্পটি ঝুলে থাকে। একপর্যায়ে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রকল্পটি নতুন করে পর্যালোচনা করে সংশোধিত প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। কমিশনের পর্যবেক্ষণের পর ব্যয় কমিয়ে এনে একনেকের অনুমোদন নেওয়া হয়।
ইউরো-৫ জ্বালানি, কমবে দূষণ। এই প্রকল্পের আরেকটি বড় দিক হলো পরিবেশ সুরক্ষা। ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জানান, “ইআরএল-২ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ২০টি প্রসেসিং ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর মাধ্যমে ইউরো-৫ মানের জ্বালানি তেল উৎপাদন সম্ভব হবে, যা বায়ুদূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সহায়ক হবে। দীর্ঘদিন ধরে যে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হচ্ছিল, এই প্রকল্প তা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি করবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বাড়বে, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে। সময়মতো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে এটি একদিকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের পথে বড় ধাপ হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারি আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল পরিশোধন করে পেট্রোল, অকটেন, ডিজেল, বিটুমিন, এলপিজি, জেট ফুয়েলসহ ১৭ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করছে। ইআরএল-২ চালু হলে এই উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে বলে আশা করছে বিপিসি।
