ঘরে বসেই মামলার আবেদন করা থেকে শুরু করে নথি জমা, অনলাইন হাজিরা, সাক্ষ্য প্রদান এবং রায়—সবকিছুই এখন সম্পন্ন হবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। এতে বিচারপ্রার্থীদের বছরের পর বছর আদালতের দ্বারে ঘুরতে হবে না, কমবে সময়, ব্যয় ও হয়রানি।
রবিবার (৩০ নভেম্বর) সকালে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির মিলনায়তনে নতুন এ সেবার উদ্বোধন করেন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা।
ই-পারিবারিক আদালতের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, “ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর এ আদালতে মামলার আবেদন থেকে প্রতিদিনের কার্যক্রম—সবই অনলাইনে হবে। কোনো কাগজের ব্যবহার থাকবে না। বিচারপ্রার্থীর মুঠোফোনেই এসএমএসের মাধ্যমে পৌঁছে যাবে প্রয়োজনীয় তথ্য। এতে নথি হারানোর ঝুঁকি কমবে, নথি অনুসন্ধান হবে দ্রুত, বিচারকার্য হবে স্বচ্ছ ও ঝামেলামুক্ত। পাশাপাশি ম্যানুয়াল ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে যাতে প্রয়োজন হলে ব্যবহার করা যায়।
আদালত সূত্র জানায়, ই-পারিবারিক আদালতে নিম্নোক্ত পাঁচ ধরনের মামলা নিষ্পত্তি হবে— বিবাহবিচ্ছেদ, দাম্পত্য অধিকার পুনরুদ্ধার, মোহরানা, ভরণপোষণ, সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজত। বাদী-বিবাদী, আইনজীবী, বিচারক ও সাধারণ মানুষ সবাই ই-পারিবারিক আদালতের ওয়েবসাইট ব্যবহার করতে পারবেন।
রয়েছে ওটিপি ভেরিফিকেশন, ডিজিটাল নথি সংরক্ষণ এবং রিয়েল-টাইম কেস ট্র্যাকিং ড্যাশবোর্ড। মামলার তারিখ, শুনানি, ভবিষ্যৎ কার্যক্রম—সবকিছুই খুদে বার্তার মাধ্যমে পাবেন বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীরা। আদালতের রেজিস্ট্রার কাজ, নথি বিভাজন ও সংরক্ষণও হবে ডিজিটালি। সাধারণত কাগজের নথি নষ্ট বা হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটলেও ই-কোর্ট ব্যবস্থায় সে ঝুঁকি আর থাকবে না।
অনলাইন হাজিরা ও সাক্ষ্য—দেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করেছে। ই-পারিবারিক আদালতে যেকোনো স্থান থেকে বাদী-বিবাদী অনলাইনে হাজিরা দিতে পারবেন, ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে, আইনজীবীরা যেকোনো সময় নিজস্ব পোর্টালে নথির খসড়া তৈরি ও আপলোড করতে পারবেন, একই নথি বারবার প্রস্তুত করার ঝামেলা কমবে, এতে সময় সাশ্রয়ের সাথে সাথে আদালতের চাপও কমবে।
সহজ রেজিস্ট্রেশনেই সেবা পাওয়া যাবে। এতে ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, নাম, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করলেই পাওয়া যাবে লগইন সুবিধা। বিচারপ্রার্থী তাঁর পছন্দের আইনজীবী বেছে নিতে পারবেন অনলাইনেই। তবে আইনজীবীদের বার কাউন্সিল সার্টিফিকেট ও ওকালতনামা আপলোড বাধ্যতামূলক থাকবে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সরকারি কৌঁসুলি রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, “পুরোনো মামলার নথি অনেক সময় আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু ই-পারিবারিক আদালতে সবই অনলাইনে সংরক্ষিত থাকবে। এতে বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীর দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।”
‘দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত হবে’ জানিয়ে আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুস সাত্তার জানান, ই-পারিবারিক হচ্ছে আদালত সম্পূর্ণ পেপারলেস। প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও প্রযুক্তি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এতে পারিবারিক বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হবে না।”
চট্টগ্রামে ই-পারিবারিক আদালতের উদ্বোধন বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ডিজিটাল যুগের নতুন মাইলফলক বলে মনে করছেন আইনজীবী ও বিচার সংশ্লিষ্টরা। ঘরে বসেই বিচারসেবা পাওয়ার এ যুগান্তকারী উদ্যোগ বিচারপ্রার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
