রেলওয়ের গাফেলতিতে কন্টেইনার পরিবহন নেমে এসেছে ৪০ শতাংশে এবং রাজস্ব আদায়ে বিরোপ প্রভাব পড়ছে ঢাকার কমলাপুরের আইসিডি। ফলে আমদানিকারকরা যেমন প্রতিদিন গুনছেন কোটি টাকার জরিমানা, তেমনি কাস্টমসের রাজস্ব আদায়ও ধস নেমেছে। এতে দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ছে।

জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় পণ্য পরিবহনের জন্য তিনটি প্রধান পথ রয়েছে— রেল, সড়ক এবং নৌপথ—যার মধ্যে রেল সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ মনে করেন আমদানিকারকরা। কিন্তু চলমান সংকটের কারণে এই রুট কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে তারা মনে করছেন। তাই যেখানে মাসে ৯০ থেকে ১০০টি কনটেইনারবাহী ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে কমলাপুর আসা-যাওয়া করত, সেখানে গত তিন মাসে নামতে নামতে দাঁড়িয়েছে ৪০ থেকে ৪৫টিতে। ফলে দুই-তিন দিনে পৌঁছানোর কথা থাকলেও এখন ১৫ থেকে ৩০ দিন লাগছে পণ্য ঢাকায় পৌঁছাতে। ঢাকার কমলাপুরের আইসিডি প্রতি বছর গড়ে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হয়। চলমান সংকটে ব্যবসায়ীরা নতুন এলসি খোলা কমিয়ে দেওয়ায় প্রতিদিন জমা পড়া বিল অব এন্ট্রি নেমে এসেছে ২০ থেকে ২৫টিতে।
বর্তমান ট্রেন চলাচল করছে দিনে গড়ে ২ থেকে ৩টি, যেখানে প্রয়োজনীয় ট্রেন সংখ্যা মাসে প্রায় ১৮০টি (প্রতিদিন ৬টি দুইমুখী ট্রেন)। পণ্য পৌঁছাতে সময় লাগছে ২ থেকে ৩ দিনের যায়গায় ১৫ থেকে ৩০ দিন। ফলে জরিমানা বা ডেমারেজ গুণতে হচ্ছে প্রতিটি কনটেইনারে দিনে ২৪ ডলার। গত মে মাসে ৬৩টি, জুন মাসে ৪৬টি, জুলাই মাসে ৪১টি এবং আগস্ট ২৮ তারিখ পর্যন্ত ৪৮টি। কাস্টসের রাজস্ব আদায়ে কমলাপুর আইসিডি থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। বিল অব এন্ট্রি প্রতিদিন আগে অর্ধশতাধিক, এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫টি।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (ডিসিএএ) এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ১৭ জুলাই রেলওয়ের মহাপরিচালককে চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, “একটি কনটেইনার পৌঁছাতে ১৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগছে। এতে শিল্প ইউনিট, আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পরিবহন ঠিকাদারসহ সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আইসিডি, কমলাপুর বর্তমানে রেলের তত্ত্বাবধানে গাজীপুরের ধীরাশ্রমে স্থানান্তরিত হচ্ছে। আধুনিক কাস্টমস হাউস নির্মাণের কাজ শুরু হলেও সম্পূর্ণ হতে সময় লাগবে ৩ থেকে ৪ বছর। এর মধ্যে রেলের ইঞ্জিন সংকট না কাটলে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ধাক্কা আসবে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
ইস্পাত আমদানিকারক জাহেদুল ইসলাম সোহান বলেন, “প্রতিটি কনটেইনারের জন্য দিনে ২৪ ডলার জরিমানা গুনছি। সেই হিসেবে দেড় হাজার কনটেইনার দিনে ৩৬,০০০ ডলার বা প্রায় ৪০ লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। আর এক মাসে সম্ভাব্য লোকসান ১২,০০,০০০ ডলার বা ১২.৭ কোটি টাকা। প্রায় এক মাস ধরে পণ্য আটকে আছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, “ঢাকার দিকের আমদানিকারকরা ১৫-২০ দিনের পণ্যের চালান বুঝে পায় না। ব্যবসায়ীরা এতে আর্থিকভাবেও ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আমাদের চাওয়া হলো রেলওয়ের ইঞ্জিন সক্ষমতা কাটিয়ে উঠুক দ্রুত। এটা রেলওয়ের জন্য একটা প্রডাক্টিভ খাত যেখান থেকে রেল প্রচুর রেভিনিউ পায়। কিন্তু বাস্তবে ঘটছে উল্টো। যেমন ঢাকার কমলাপুর কনটেইনার ইয়ার্ডের মেইনটেন্যান্স পুরোপুরি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ করার কথা থাকলেও সেটাও তারা করছে না। ফলে সেখানকার ইয়ার্ডের রক্ষণাবেক্ষণও আমাদের অর্থায়নে চালিয়ে যেতে হচ্ছে।”
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন স্বীকার করেছেন, ‘আমাদের ইঞ্জিন সংকট দীর্ঘদিনের। দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনকে গুরুত্ব দিয়ে পণ্য পরিবহনে পর্যাপ্ত ইঞ্জিন সরবরাহের চেষ্টা থাকে রেলওয়ের। অনেক সময় ইঞ্জিনের সংকট, বিকল হওয়ার ঘটনা বাড়লে পণ্য পরিবহন খাতে ইঞ্জিনের সরবরাহ কমে যায়। বর্তমানে কনটেইনারসহ পণ্য পরিবহন কিছুটা কমে এলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে রেলওয়ে প্রকল্পের অধীনে ইঞ্জিন আমদানি, বেশকিছু পুরনো ইঞ্জিন মেরামতের পরিকল্পনা করছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পণ্য পরিবহন খাতে রেলের হিস্যা আরো বাড়বে বলে দাবি করেছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দর ও রেলওয়ে—দুটি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা ব্যবসায়ীদের লোকসান বাড়াচ্ছে। বন্দর ও রেল যৌথ উদ্যোগে কনটেইনার পরিবহন খাতে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে দেশের বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে।
উল্লেখ্য, দেশের শিল্প ও আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার চট্টগ্রাম বন্দর। ১৯৮৬-৮৭ অর্থবছরে বন্দরটি থেকে ঢাকায় কমলাপুর ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোয় (আইসিডি) রেলপথে কনটেইনার পরিবহন শুরু হয়। ২০০০-০১ অর্থবছরে উভয়পথে (চট্টগ্রাম বন্দর-ঢাকা কমলাপুর আইসিডি) পর্যন্ত কনটেইনার পরিবহন হয় ৫২ হাজার ৭৩৭টি। কয়েক বছরের মধ্যে রেলপথে কনটেইনারের পরিবহন বেড়ে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে উন্নীত হয় ৮১ হাজার ২৭০টিতে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতি বছর পণ্য আমদানি-রপ্তানি ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়লেও সে তুলনায় কমেছে রেলপথে কনটেইনার পরিবহন। ফলে বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে ব্যয় বাড়ছে ব্যবসায়ীদের।
