দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও অব্যবস্থাপনার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের আর্থিক খাতে একযোগে ৯ প্রতিষ্ঠানের পতন নিঃসন্দেহে আস্থার সংকট তৈরি করবে। তবে একইসঙ্গে এটি হতে পারে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত একটি খাতকে নতুন করে গড়ে তোলার সূচনা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (২১ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের রেজ্যুলেশন বিভাগে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের অনুমোদনে এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা পাঠানো হয়। জানানো হয় অবসায়নের সময় ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে এবং কর্মরত কর্মচারীরা চাকরিবিধি অনুযায়ী সব সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
প্রাথমিকভাবে দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে - ফাস ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং, ফেয়ারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স, অ্যাভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং।
এসব প্রতিষ্ঠান বহুদিন ধরে বিপুল খেলাপি ঋণ ও আর্থিক অনিয়মের কারণে অচল অবস্থায় পড়ে ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে এনবিএফআই খাতে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৮৯ কোটি টাকা। এর অর্ধেকেরও বেশি—প্রায় ৫২ শতাংশ—ঋণ বহন করছে এই ৯টি প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, সরকার নীতিগতভাবে এই সিদ্ধান্তে সম্মতি দিয়েছে। হাইকোর্টের মাধ্যমে লিকুইডেশন কার্যক্রম শুরু হবে আগামী সেপ্টেম্বর থেকেই। আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাই হবে প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য।
৯টির বাইরে আরও অন্তত ১১টি এনবিএফআই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। জানুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০টি প্রতিষ্ঠানকে ‘রেড ক্যাটাগরি’তে রেখেছিল। এর মধ্যে রয়েছে সিভিসি ফাইন্যান্স, বে লিজিং, ইসলামিক ফাইন্যান্স, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স, হজ ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল ফাইন্যান্স, উত্তরা ফাইন্যান্সসহ আরও কয়েকটি।
আর্থিক সূচক অনুযায়ী সমস্যাগ্রস্ত ২০ প্রতিষ্ঠানের ঋণ ২৫ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ- ২১ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা বা ৮৩.১৬ শতাংশ, বন্ধকি সম্পদের মূল্য- ৬ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা, মূলধন ঘাটতি - ১৯ হাজার ২১৮ কোটি টাকা, পুঞ্জীভূত লোকসান - ২৩ হাজার ৪৪৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, তুলনামূলক ভালো অবস্থার ১৫টি প্রতিষ্ঠান গত বছর লাভ করেছে ১ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা, যেখানে মূলধন উদ্বৃত্ত রয়েছে ৬ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটি একদিকে খাতটির প্রতি জনআস্থা নষ্ট করতে পারে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরিয়ে দিলে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এটিকে তাঁরা একটি “ক্লিন-আপ প্রক্রিয়া” হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক আশ্বস্ত করেছে যে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে প্রথম অগ্রাধিকারে। তবে তা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অবশিষ্ট সম্পদ ও আদালত-নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার ওপর। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই ৯ প্রতিষ্ঠানের অবসায়নে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
